‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ, সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম


‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ, সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ২৫টি আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করাসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে সংগঠনগুলো দাবি করে, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে চিটাগং হিল ট্র‍্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন আদিবাসী পরিচয় নিয়ে বক্তব্য দেন।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ওই অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই এবং দেশের সব নাগরিকের মূল পরিচয় ‘বাংলাদেশী’—এমন বক্তব্য দিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রীর এমন বক্তব্য ইতিহাস ও বাংলাদেশের বহুজাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা এসব বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বহু জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা ও জীবনধারা নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে এসব জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়।

এতে আরও বলা হয়, আদিবাসীদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তার জায়গায় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এমন বক্তব্য তাদের আরও প্রান্তিক করে তুলতে পারে।

জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংগঠনগুলো বলেছে, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ঘোষণাপত্রটি গৃহীত হয়। তাদের মতে, বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় ঘোষণাপত্রের নীতিগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া উচিত।

মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার’ বক্তব্যেরও সমালোচনা করেছে সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আদিবাসীদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিবর্তে বৃহত্তর বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে একীভূত করার ধারণাকে উৎসাহিত করতে পারে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারকে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একরৈখিক ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে ন্যায়, সমতা, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়।

সংগঠনগুলোর দাবিগুলো হলো—
১. বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র-২০০৭ বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদসহ মোট ২৫টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেছেন বলে জানানো হয়।

বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা।

Ads