খাগড়াছড়িতে মৎস্য উৎপাদনে পানি সংকটসহ নানা বাধা, বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণের তাগিদ


খাগড়াছড়িতে মৎস্য উৎপাদনে পানি সংকটসহ নানা বাধা, বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণের তাগিদ

পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে মৎস্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পানির সংকট, নদী-জলাশয় ভরাট, খরা, সময়মতো পোনা না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে পানি সংরক্ষণ, ছোট বাঁধ ও জলাধার নির্মাণসহ স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মৎস্য খাতসংশ্লিষ্টরা।

রোববার (১৬ আগস্ট) ‘রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। খাগড়াছড়ি পৌর টাউন হল মিলনায়তনে জেলা মৎস্য অধিদপ্তর এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতির কারণে এখানে মাছ চাষের জন্য পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দেয়, আবার বর্ষায় পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনাময় অনেক জলাশয় ও চাষের স্থান পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। তাই পাহাড়ি বাস্তবতার উপযোগী পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

সভায় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুদৃষ্টি চাকমা জানান, জেলায় মৎস্য উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে নদী ও জলাশয় ভরাট, খরা, পানির অপর্যাপ্ততা এবং সঠিক সময়ে পোনা না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ফলে মৎস্যচাষিরা অনেক সময় চাষের শুরুতেই ক্ষতির মুখে পড়েন। তিনি বলেন, সরকারি মাছ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর খাগড়াছড়িতে মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার মেট্রিক টন। চলতি বছরে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ১০৩ মেট্রিক টন। মৎস্য চাষের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে যা যা প্রয়োজন, তা করা হবে। সরকারি কার্যক্রমের ওপর আস্থা রেখে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনা সভায় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. রাজু আহমেদের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) কামরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবসার এবং খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য।

মৎস্যচাষিরাও তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রামগড়ের পুরস্কারপ্রাপ্ত মৎস্যচাষি মো. সেলিম বলেন, ইউটিউবের ভিডিও দেখে তিনি মাছ চাষ শুরু করেছেন। তবে মাছ চাষে সফল হতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ম-কানুন ও সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে।

মধ্য বোয়ালখালীর মৎস্যচাষি উজ্জ্বল বলেন, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই তাদের মাছ চাষ করতে হয়। স্থানীয় সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ পেলে চাষিরা আরও ভালোভাবে উৎপাদন করতে পারবেন।

আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ছড়া, জলাশয় ও অন্যান্য জলসম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে মৎস্য উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, মানসম্মত পোনা সরবরাহ এবং চাষিদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা, সাধারণ সম্পাদক এইচ এম প্রফুল্লসহ রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে তিনজন মৎস্যজীবী ও চাষিকে সম্মাননা স্মারক ও সনদ দেওয়া হয়। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারের জন্য দীঘিনালা উপজেলার একজন মৎস্যচাষি নির্বাচিত হয়েছেন বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

পরে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়।

Ads