৯টি ঝুঁকিতে মেট্রোরেল

কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির মূল্যায়ন

মুহাম্মদ ইসমাইল হাসান

২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম


কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির মূল্যায়ন


দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ এর পরিচালন ও কাঠামোগত সুরক্ষায় ৯টি গুরুতর ঝুঁকির ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় গঠিত কারিগরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটি। ত্রুটিগুলোর মধ্যে ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডের অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি বিকৃতি, পিয়ার ও বক্স গার্ডারে ফাটল এবং অস্বাভাবিক কম্পন উল্লেখযোগ্য। কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে, এগুলো নিছক কোনো সাধারণ বা বিচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণজনিত ত্রুটি নয়; বরং নকশার নিরাপত্তা, তৃতীয় পক্ষের যাচাই, নির্মাণের মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্ষমতার ক্ষেত্রে বিস্তৃত দুর্বলতার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

রাজধানীর গণপরিবহণ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল প্রকল্পটি বর্তমানে নিবিড় কারিগরি পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী বহনকারী ১৬টি উড়াল স্টেশনবিশিষ্ট এই রুটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মেট্রোরেলের চিহ্নিত ঝুঁকি ও কারিগরি দুর্বলতা
নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে মেট্রোরেলের যে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো— বেয়ারিং প্যাডের বিকৃতি ও স্থানচ্যুতি, পিয়ার, কংক্রিট বেস ও বক্স গার্ডারে ফাটল, সাময়িক গতিসীমার কারণে যাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য হ্রাস, ডিপো ও ট্র্যাকের ভিত্তি বসে যাওয়া, ট্রেনজনিত কম্পন ও কার্যক্ষমতার ঘাটতি, নির্ধারিত স্থানের আগে ট্রেন থেমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি ও চাকার ক্ষয়, স্থায়ী কাঠামোগত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি। ডিএমটিসিএলের রেকর্ড অনুযায়ী, ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ বেয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ, যা দ্রুত বদলানো প্রয়োজন। এছাড়া বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায়ও ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক কক্ষের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সমস্যা, স্পার্কিং এবং ১৬টি স্টেশনের সিগন্যালিং কক্ষে পানি প্রবেশের মতো গুরুতর সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, যা থেকে শর্টসার্কিট বা আগুনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও নেপথ্যের কারণ
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি কমিটির সদস্য, বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক প্রতিদিনের চিত্র-কে জানান, চিহ্নিত ৯টি ঝুঁকি সমাধানে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়নও শুরু করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট জাপানি প্রতিনিধিরা কমিটিকে জানিয়েছেন যে, তৎকালীন সরকারের দ্রুত উদ্বোধনের তাগিদের কারণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা পেশাদার সিদ্ধান্ত ছিল না। অন্যদিকে, বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন হাসান প্রতিদিনের চিত্র-কে বলেন, দেশীয় কোনো কারিগরি তদারকি ছাড়াই শুধু জাপানি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে কাজ করানোর খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। অত্যন্ত জরুরি কারিগরি ইস্যু বাদ দিয়ে উদ্বোধনের এই ঘটনা থেকে সরকারের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

গতি কমিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলার চেষ্টা
ঝুঁকি এড়াতে এবং দুর্ঘটনা রোধে বর্তমানে মেট্রোরেলের গতি কমানো হয়েছে। মূল লাইনের ১০টি স্থানে নকশাগত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটারের পরিবর্তে ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে (যা ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর ছিল)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে ট্রেনগুলো এই সীমার চেয়েও ১৩ থেকে ১৬ কিলোমিটার কম গতিতে চলছে। অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি ও নির্ধারিত স্থানে ট্রেন না থামার মতো ত্রুটি এবং চাকার ক্ষয়ের কারণে ইতিমধ্যে পাঁচটি ট্রেন সেট যাত্রী পরিবহণ থেকে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল। তবে কমিটির মতে, গতি কমানো কেবল তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমাতে পারে, এটি সমস্যার মূল সমাধান নয়।

নিরীক্ষার প্রেক্ষাপট
এই নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার মূল কারণ হলো বিগত ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর সংঘটিত একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ওই দিন ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে ৪৩৩ নম্বর পিয়ার থেকে একটি বেয়ারিং প্যাড খসে পড়ে ৩৫ বছর বয়সি আবুল কালাম আজাদ নিহত এবং আরও দুজন আহত হন। এর প্রায় ১৩ মাস আগেও কাছাকাছি স্থানে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে তিনটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত পুরো এমআরটি লাইন-৬-এর নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ দেন।

কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ
কারিগরি কমিটি জানিয়েছে, তাদের পক্ষে যন্ত্রনির্ভর পূর্ণাঙ্গ গতিশীল পরীক্ষা বা পুরো রুটের ট্র্যাক-জ্যামিতি জরিপ করা সম্ভব হয়নি। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের পরামর্শক দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমস্যাগুলোকে সাধারণ ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা না করে সামগ্রিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাঠামোগত মেরামত ও স্বাধীন নিরাপত্তা যাচাইকে অগ্রাধিকার দিয়ে জরুরি সংশোধনমূলক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. আহসান উল্লাহ শরিফী প্রতিদিনের চিত্র-কে লিখিত বার্তায় জানান, কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারে ১০টি স্টিল ব্র্যাকেট বসানো হয়েছে। বেয়ারিং প্যাড পরিবর্তন, সেটেলমেন্ট মার্কার ও ক্র্যাক গেজ বসানোর কাজ চলছে। পিয়ার ও বক্স গার্ডারের ফাটলের স্থায়ী সমাধানে বুয়েটকে যুক্ত করার উদ্যোগসহ স্পার্কিং ও স্টেশনে পানি প্রবেশের সমস্যা সমাধানেও কাজ চলছে।

প্রকল্পের ব্যয় ও সময়কাল
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২৬ জুন মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের চলাচল শুরু হয়। ২০২২ সালে একনেকে অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী, কমলাপুর সম্প্রসারণসহ এর মোট ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭১ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, কিলোমিটার প্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।

Ads