ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই ক্যামেরার চমক
৯১ শতাংশ কমল ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, ফিরছে শৃঙ্খলা
২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের চিরচেনা দৃশ্য যেন জাদুর মতো বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের পর পরই মহাসড়কে অভাবনীয় শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের সচেতনতা, যার ফলে জ্যামিতিক হারে কমছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা। ‘প্রতিদিনের চিত্র’-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রযুক্তিগত এই যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র।
স্থানটি দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক (গাজীপুর ও কুমিল্লা রিজিওন)। গত ১৮ আগস্ট (রবিবার) এই মহাসড়কে এআই ক্যামেরার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং এর পরদিন ১৯ আগস্ট (সোমবার) মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রযুক্তির এই কড়া নজরদারির বাস্তব প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
এক দিনেই বদলে যাওয়া চিত্র-
পরিসংখ্যান বলছে, এআই ক্যামেরা চালুর প্রথম দিন (১৮ আগস্ট) মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি ও উলটো পথে গাড়ি চালানোর দায়ে মোট ৪৪৬টি মামলা রুজু হয়। এর মধ্যে অতিরিক্ত গতির জন্য ৪১৭টি (কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৯৭টি এবং গাজীপুর অঞ্চলে ২০টি) এবং উলটো পথে চলার জন্য ২৯টি (গাজীপুর অঞ্চলে ২৩টি ও কুমিল্লা অঞ্চলে ৬টি) মামলা হয়। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ঠিক পরদিন অর্থাৎ ১৯ আগস্ট এই মামলার সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৪২টিতে। এক দিনের ব্যবধানেই মামলা কমেছে প্রায় ৯১%! এদিন গাজীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলে কেবল অতিরিক্ত গতির জন্যই ৪২টি মামলা হয়, আর উলটো পথে গাড়ি চালানোর কোনো ঘটনাই ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
প্রকল্পের পরিধি ও সক্ষমতা
হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে ১৪২ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। সারা দেশে আটটি অঞ্চলের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেখভাল করা হলেও, এই বিশেষ প্রকল্পটি গাজীপুর (নারায়ণগঞ্জ অংশ পর্যন্ত) ও কুমিল্লা (দাউদকান্দি থেকে সিটি গেট পর্যন্ত) অঞ্চলের আওতাধীন।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
১। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে ৪৯০টি খুঁটিতে ১ হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা।
২। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ১টি ডেটা সেন্টার এবং ৫টি মনিটরিং সেন্টার।
শনাক্তকরণ সক্ষমতা
অতিরিক্ত গতি, উলটো পথে চলাচল, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল রাইড, থ্রি-হুইলার চলাচল, সিগন্যাল অমান্য ও অবৈধ পার্কিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড।
আইন ও জরিমানার বিধান
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, মহাসড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। এই আইন অমান্য করলে এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্ত করে চালক বা মালিকের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে দিচ্ছে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে জরিমানা- ২ হাজার ৫০০ টাকা আর উলটো পথে চললে জরিমানা ৩ হাজার টাকা।
প্রযুক্তির এই ব্যবহার প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস) মুনতাসিরুল ইসলাম ‘প্রতিদিনের চিত্র’-কে জানান "স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্ত করে মামলা হওয়ায় এতে মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। মামলা অটোমেটিক হচ্ছে, অটোমেটিক মোবাইলে মেসেজ চলে যাচ্ছে। আপনাকে সেটা পে করতে হচ্ছে। মামলা এড়ানোর কোনো রাস্তা থাকবে না।"
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর এই উদ্যোগের মূল্যায়ন করা হবে এবং এর ফলে মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা দীর্ঘস্থায়ী হবে। চালকদের মধ্যেও এই প্রযুক্তির কারণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাসের যাত্রী কামরুল ইসলাম ও মোটরসাইকেল চালক আব্দুল করিমের মতে, ক্যামেরার ভয়ে এখন চালকদের মধ্যে বেপরোয়া গতির প্রবণতা কমেছে এবং সবাই মামলা এড়াতে সাবধানে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহম্মেদ খোকন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি না চালানোর নির্দেশনা দিয়ে ইতিমধ্যে সব গাড়িতে সমিতির পক্ষ থেকে সার্কুলার জারি করা হয়েছে।" তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, লাইসেন্স বা ফিটনেস নবায়নের সময় ক্যামেরার রেকর্ড থেকে অপরাধ নিশ্চিত হওয়া সহজ হবে, যা চালকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা তৈরি করবে এবং ধীরে ধীরে সড়কে আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা পুরোপুরি কমে আসবে।























