মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবসানের ইঙ্গিত: চুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবসানের ইঙ্গিত: চুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের

 

দীর্ঘদিনের সংঘাত ও চরম উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে উভয় পক্ষই। এই সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আলোচনার শেষ ধাপ সম্পন্ন হলেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা হতে পারে।” তিনি জানান, চুক্তির প্রথম শর্তই হলো ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। জবাবে ইরানও ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা আঘাত হানে। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশের নিয়ন্ত্রক ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও চলতি সপ্তাহেও দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। তবে নতুন এই সমঝোতা চলমান সংকট কাটাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচকরা একটি ‘দারুণ সমঝোতায়’ পৌঁছানোয় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সামরিক হামলা বাতিল করেছেন। তবে ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ১৪ দফা চুক্তির খসড়াকে ‘অসত্য’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, এই চুক্তি কোনো পারস্পরিক অন্ধ বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং ‘কার্যকর বাস্তবায়নের’ ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। তেহরান চুক্তির শর্ত পূরণ করছে কিনা, তা যাচাই করেই কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে।

হরমুজ প্রণালি ও জাহাজ চলাচল: মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। তবে প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। ইরান সেখান দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের দাবি করলেও, যুক্তরাষ্ট্র চায় এই পথ সবার জন্য উন্মুক্ত ও অবাধ থাকুক।

পর্যায়ক্রমিক অর্থনৈতিক সুবিধা: ইরানি গণমাধ্যমের দাবি নাকচ করে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানকে কোনো অর্থ আগাম দেওয়া হবে না। ধাপে ধাপে দেশটির জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃঅন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ইউরেনিয়াম ধ্বংস ও পারমাণবিক আলোচনা: চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্ব শুরু হবে। এর অধীনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল উপাদান হিসেবে বিবেচিত ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত দেশটির ভেতরেই ধ্বংস করে বাইরে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে মূল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে আরও পরে।

প্রক্সি গোষ্ঠীর অর্থায়ন বন্ধ: চুক্তির শর্তানুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরান-সমর্থিত অন্যান্য প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই চুক্তির আওতায় ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


চলমান এই আলোচনায় ইসরায়েল সরাসরি অংশ না নিলেও এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির পথ সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা ফলপ্রসূ রূপ পেয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন যে, দুই পক্ষই সমঝোতা স্মারকে ঐকমত্যে পৌঁছেছে এবং এখন কেবল চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।

বিগত মাসগুলোতে বেশ কয়েকবার সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েও শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গিয়েছিল। তবে এবার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর খোলামেলা অবস্থান ও ইতিবাচক মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফেরার নতুন আশা জাগাচ্ছে।

 

Ads