জানতে হবে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়ম
১১ মে ২০২৪, ০২:১০ পিএম
ছবি- সংগৃহীত।
হার্ট ডিজিজ আর স্ট্রোকে মৃত্যুর শীর্ষ কারণ বলা হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপকে। কিন্তু রক্তচাপ মাপতে ভুল করলে উচ্চ রক্তচাপের রোগী শনাক্ত করা যাবে না। সঠিকভাবে না মাপার জন্য ৫০ শতাংশ রোগীর রক্তচাপ সঠিক জানা যায় না। এ জন্য জানতে হবে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়ম।
বিস্তারিত জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী
১. প্রথমে নিতে হবে ভ্যালিডেটেড সেমি অটোমেটেড বা অটোমেটেড ডিভাইস। স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় এর ব্যবহার সহজ।
২. নির্বাচন করুন সঠিক কাফ সাইজ। একে জড়িয়ে নিন বাহুতে, সঠিক অবস্থানে।
৩. যার রক্তচাপ মাপা হবে তাঁকে প্রস্তুত করুন। দেখুন রক্তচাপ মাপার জন্য তিনি তৈরি কি না। তাঁকে শান্ত আর নিশ্চিন্ত হতে হবে। কোনো দুশ্চিন্তা করা যাবে না।
ধূমপান করা যাবে না, চা বা কফি পান এড়াতে হবে। শান্ত হয়ে বসে থাকবেন পাঁচ মিনিট। জানতে হবে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়মমাপার সময় বা মাপার ঠিক আগে রোগী বা যিনি মাপবেন কেউ কথা বলবেন না। পরিবেশ হতে হবে স্বস্তিকর। রোগীর আসনের পেছনে থাকবে ব্যাক সাপোর্ট।
বাহু থাকবে উন্মুক্ত। হাফ হাতা কাপড় পরা থাকলে ভালো। বাহুর ভেতর দিকে ব্লাড প্রেসার কাফ বাহুতে বাঁধা থাকবে। বাহু থাকবে হার্ট লেভেলে। একটু নিচে বাহু থাকলে এর নিচে দিন বালিশ। পায়ের পাতা থাকবে মেঝেতে। বাহুর ধমনির ওপর চাপ পড়বে কাফের। কাফ যেন খুব টাইট বা শিথিলভাবে প্যাঁচানো না হয়। কাফের ভেতর দিয়ে দুটি আঙুল যেন আলতো যেতে পারে।
৪. এই ধাপে রক্তচাপ মাপতে হবে। ডিভাইস অন করতে হবে। কাফ ফুলবে। একসময় রিডিং চলে আসবে ডিভাইসের ডিসপ্লেতে।
অন্য বাহুতে মেপে দেখতে পারেন। যে বাহুতে বেশি রিডিং থাকবে প্রতিবার সেই বাহুতে মাপা উচিত। এক মিনিট পর আবার মাপুন। আরেক মিনিট পর নিন তৃতীয় রিডিং। প্রথম ভিজিটে চারবার মাপতে হবে। দুটি বাহুতে একবার করে মাপার পর যে বাহুতে রিডিং বেশি আসবে সেই বাহুতে আরো দুবার মোট চারটি রিডিং নিতে হবে। সব রিডিং লিখে রাখতে হবে।
৫. এই ধাপে ফলাফল রেকর্ড করতে হবে। সব ফলের গড় নিতে তিন রিডিংয়ের প্রথম রিডিং যদি পরের দুটির থেকে বেশ বেশি থাকে, তাহলে সেটিকে বাদ দিতে হবে। পরের দুটি ফলের গড় নিতে হবে। যা লিখবেন—গড় রক্তচাপ, ডান বাহুর কাফ সাইজ, প্রতি মিনিটে হৃত্স্পন্দনের হার, তারিখ, বয়স, লিঙ্গ এবং কোনো উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাচ্ছেন কি না।
কখন বুঝবেন আপনার উচ্চ রক্তচাপ আছে?
ব্লাড প্রেসারের দুটি রিডিং যেমন ১২০/৮০ প্রথমটি সিস্টলিক হার্ট যখন স্পন্দিত হয় বা সংকুচিত হয় তখন রক্তনালিতে যে চাপ তা হলো ‘সিস্টলিক রক্তচাপ’। আর নিচেরটা হলো ‘ডায়াস্টলিক’। পর পর দুদিন ১৪০/৯০ পেলে তা হলো উচ্চ রক্তচাপ। সাধারণভাবে ১২০/৮০ মিমি পারদ হলো স্বাভাবিক রক্তচাপ।
হঠাৎ করেই রক্তচাপ বেড়ে তা প্রাণ সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বিজ্ঞানীরা একে বলেন নীরব ঘাতক। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বছরে এক কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়। এই সংখ্যা যা অনেক সংক্রামক রোগের চেয়ে বেশি। দেশে ৬৮ শতাংশ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ। উচ্চ রক্তচাপের কারণে মৃত্যুর হার ৩৩ শতাংশ। এটা ২০২২ সালের হিসাব।
চলতি বছরের জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী দেশে পাঁচজনের মধ্যে একজনের রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে মাত্র ১৪ শতাংশ রোগী একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন। ২০২২ সালে আরেক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহুরে জনগোষ্ঠীর ২৩ শতাংশের রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ।
উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক আর কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। আর বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ।
তরুণদের মধ্যেও হানা দিচ্ছে
অনেকের ধারণা ছিল, উচ্চ রক্তচাপ শুধু বয়স্কদের হয়। এ চিত্র কিন্তু পাল্টে গেছে। অনেক তরুণের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিচ্ছে। পুরুষদের চেয়ে নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ নীরবেই শরীরে বাসা বাঁধে। ধরা পড়ে না। তাই একে শনাক্তর একমাত্র উপায় রক্তচাপ মেপে দেখা। আর তাই এ বছরের প্রতিপাদ্যে রক্তচাপ মাপা আর একে নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে কারো যদি হৃদযন্ত্রের সমস্যা বা অন্য ঝুঁকি থাকে, তাহলে ওপরেরটা ১৩০ হলে সতর্ক হওয়া ভালো। ১৩০/৮০-এর বেশি হলে ডাক্তার অবস্থা বিবেচনায় জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আর ওষুধ দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা
■ বয়স্ক মানুষ
■ পারিবারিক ইতিহাস যাঁদের আছে
■ যাঁদের ওজন অনেক বেশি
■ যাঁরা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকেন
■ যাঁদের বেশি লবণ খাওয়ার অভ্যাস আছে
■ ডায়াবেটিক রোগী
■ কিডনি রোগ আছে যাঁদের
■ যাঁরা নিয়মিত ফাস্ট ফুড খান, নোনা খাবার বা তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খান
■ খুব বেশি মদ্যপান করেন।
রক্তচাপের মাত্রা বেশি থাকলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়—
■ মাথা ধরা
■ মাথা ঝিমঝিম করা
■ চোখে ঝাপসা দেখা
■ বুকে ব্যথা
উচ্চ রক্তচাপ অনেক বেশি হলে (১৮০/১২০) যেসব লক্ষণ দেখা দেয়—
■ খুব মাথা ধরা
■ বুক ব্যথা
■ মাথা ঝিমঝিম করা
■ শ্বাসকষ্ট
■ বমি বমি ভাব
■ চোখে ঝাপসা দেখা
■ দুশ্চিন্তা
■ হতবিহ্বল অবস্থা
■ কানে ঝিনঝিন শব্দ শোনা
■ নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ
■ অস্বাভাবিক হৃত্স্পন্দন।
■ এসব লক্ষণ থাকলে রক্তচাপ মাপুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
চিকিৎসা
■ প্রথমেই পরিবর্তন আনতে হবে জীবনযাত্রায়। খেতে হবে স্বাস্থ্যকর খাবার। যেমন—শাক-সবজি (আঁশযুক্ত), ফল, মাছ, লাল মাংস, বিনস (বরবটি), লবণ ও চিনি খাওয়া কমাতে হবে। বেশি ওজন থাকলে তা কমাতে হবে। শরীরচর্চার জন্য হাঁটতে পারেন, সাইকেল চালাতে পারেন। সপ্তাহে ১৫০ মিনিট শরীরচর্চা করতে হবে। বাদ দিতে হবে ধূমপানের অভ্যাস। সুযোগ পেলেই বসবেন না। সচল থাকার চেষ্টা করুন।
প্রতিরোধে যা করবেন
■ ফল খাবেন বেশি
■ সক্রিয় থাকুন
■ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
■ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
■ দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে চেষ্টা করুন।



































