ড. ইউনূস কি আসলেই চলে যাবেন? একটি আত্মজিজ্ঞাসার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
২৫ মে ২০২৫, ০২:০৫ পিএম
বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে আমরা দ্রুত আবেগে দৌড়াই, আবার হঠাৎ দিক পাল্টায়। আজ যাকে সম্মান দিই, কাল তাকেই প্রশ্নবাণে ঝাঁঝরা করি। এই ধারাবাহিকতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেন এক জীবন্ত প্রতীক -যিনি বিশ্বমঞ্চে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, আর দেশে ফিরে হয়েছেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
এই প্রশ্নটি এখন বাতাসে ঘুরছে: ড. ইউনূস কি চলে যাবেন?
প্রশ্নটি সরল, কিন্তু উত্তরটি ততটাই গভীর, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ড. ইউনূস: একজন ব্যক্তি না, একটি সম্ভাবনা:
নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মানুষটি একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশে “ক্ষুদ্রঋণ” ধারণাকে অস্ত্র বানিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-নীতির ভাষা বদলে দিয়েছেন। অথচ একই ব্যক্তি যখন দেশজ রাজনীতিতে কিছুটা বেফাঁস হয়ে দাঁড়ালেন, তখন তাঁকে ঘিরে শুরু হলো প্রশ্ন, কটাক্ষ, বিচার ও অবজ্ঞার ধারাবাহিকতা।
এখন প্রশ্ন, তিনি কী চুপচাপ থেকে গেছেন? নাকি তাঁকে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের গণতন্ত্রের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতিতে ‘চুপ থাকা’ একধরনের উচ্চারণ:
যখন রাজনীতি হয়ে পড়ে চরম মেরুকৃত, তখন চুপ থাকা নিজেই একটি রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ড. ইউনূস কারো বিরুদ্ধে দাঁড়াননি, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কোনও দলের হয়ে যাননি, কিন্তু উন্নয়ন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। সেখানেই তিনি সমস্যায় পড়েছেন। কারণ, আজকের রাজনীতিতে মধ্যপন্থা মানেই সন্দেহের শিকার হওয়া।
তিনি যখন কথা বলেন, বলা হয় তিনি বিদেশী এজেন্ট।
তিনি যখন চুপ থাকেন, বলা হয় নাটক করছেন।
কেন তিনি ক্লান্ত?
এই দেশের গণতন্ত্র একসময় স্বপ্ন ছিল। এখন তা হয়ে উঠেছে রুটিন নাটক। যেখানে নির্বাচন মানে 'নির্বাচন', বিরোধিতা মানে 'রাষ্ট্রবিরোধিতা', আর ভিন্নমত মানে 'ষড়যন্ত্র'। এর ভেতর দিয়ে একজন শিক্ষিত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে পারার মতো মানুষ যখন কিছু গড়তে চান—তাকে বলা হয়, "আপনি কাকে সঙ্গে নিয়ে খেলছেন?"
ড. ইউনূস কি ক্লান্ত? হ্যাঁ, কারণ তিনি কিছু গড়তে চেয়েছেন। আর যারা গড়তে চায়, তারা বারবার ভাঙার যন্ত্রণা পায়।
রাজনীতি বনাম রাষ্ট্রনীতি:
আমাদের রাজনীতি এখন শুধুই ক্ষমতা কেন্দ্রিক। সেখানে রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন—সবই গৌণ। অথচ ড. ইউনূসের অবস্থান বরাবরই রাষ্ট্রনির্ভর ছিল না, ছিল রাষ্ট্রনির্মাণমূলক। তিনি চেয়েছেন বিকল্প ভাবনার জায়গা। আর তাতেই বিপদ।
আমরা রেস্টুরেন্টে বিরিয়ানি খেতে যাই, চা পেয়ে ক্ষুব্ধ হই। ড. ইউনূস সেই চা ওয়ালা না, তিনি আসলে নতুন এক রেস্তোরাঁ বানাতে চেয়েছিলেন।
আজ যদি তিনি চলে যান?
তাহলে আমরা শুধু একজন ব্যক্তি হারাব না, হারাব- বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনা, চিন্তার স্বাধীনতার পরিসর ও সমাজ সংস্কারের উদ্যম।
যদি ইউনূস চলে যান, আমরা ফের একবার প্রমাণ করব- এই দেশে ব্যতিক্রমী মানুষ টিকে থাকতে পারে না। ‘আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হব, যেখানে প্রশ্ন নয়, চাটুকারিতা টিকে থাকবে; প্রতিভা নয়, প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠা পাবে।’
আমরা কী দেখছি না?
আমরা বারবার ঘোড়াটাকে দেখে বলি “ঘোড়া।” কিন্তু ঘোড়ার পিঠে থাকা মানুষটা কোথায় যাচ্ছে, সে প্রশ্ন করি না।
ড. ইউনূস কোথায় যাচ্ছেন? তিনি কার সঙ্গে যাচ্ছেন? এটা বড় প্রশ্ন নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত: কেন এমন একজন মানুষ চলে যেতে চাইছেন?
এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক দলগুলোর হৃদয়ে কাঁপন তুলতে বাধ্য। কারণ আজ যাঁরা ক্ষমতায়, কাল তাঁদেরও প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।
রাজনীতি যদি প্রতিযোগিতা হয়, তাহলে প্রতিপক্ষ না থাকলে সেই খেলার মর্যাদাই থাকে না।
ড. ইউনূস যদি সত্যিই চলে যেতে চান, তাহলে আমাদের বলার কিছু থাকবে না।
কিন্তু যদি আমরা চাই একটি গঠনমূলক, উদার, চিন্তাশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে-তাহলে আমাদের বলা উচিত: ‘থেকে যান, কারণ আপনাকে এখনও রাষ্ট্রের দরকার।’
আজ যারা তাকে ভয় পায়, তারাই কাল নিজেই বলবে, “সেই লোকটা গেলে আমাদেরও কিছু হারিয়ে গেছে।”
“ভালো মানুষ হতে গেলে ভুল করা যায়, কিন্তু ভুল ভাবা গেলে ভালো মানুষ আর বেঁচে থাকতে পারে না।”
আমরা যদি ভাবনায় ভুল না করি, তাহলে হয়ত ড. ইউনূস শুধু থাকবেন না, এই দেশকে ভাবার সাহসও ফিরিয়ে দেবেন।
ড. ইউনূস ও বাংলাদেশের বিকল্প রাজনীতি:
‘যখন রাজনীতি দলকানা হয়ে পড়ে, তখন একজন চিন্তাশীল নাগরিকই হয়ে ওঠে বিপ্লব।’
এই বাক্যটি যেন হুবহু মানিয়ে যায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর ক্ষেত্রে। তিনি রাজনীতিবিদ নন, কিন্তু তাঁকে ঘিরেই আজ বাংলাদেশের বিকল্প রাজনৈতিক চর্চার আলোচনা হচ্ছে। কেন? কারণ তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন একটা ‘অন্যরকম রাজনীতির’ প্রতীক -যেখানে ক্ষমতা নয়, মূল কথা ছিল বিকাশ।
বাংলাদেশের রাজনীতির বন্দি কাঠামো:
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুই মেরুতে আটকে আছে। এই দুই মেরুতে চলছে দুর্নীতি বনাম দুর্নীতির গল্প, অপশাসন বনাম অতীত অপশাসনের প্রতিযোগিতা। জনগণের কথা আছে শ্লোগানে, বাস্তবে নেই সংসদে। এদেশে নেতা মানে ক্ষমতার মঞ্চে উঠা মানুষ, রাষ্ট্রনায়ক মানে দলে থাকার প্রতিদান। সেখানে ড. ইউনূস এসেছিলেন অন্য গল্প নিয়ে।
তিনি বলেছিলেন:
– রাজনীতি মানেই দলীয় দখল নয়, হতে পারে নাগরিক বিকাশের প্ল্যাটফর্ম।
– রাজনীতি মানে নির্বাচনী হিসাব নয়, হতে পারে সামাজিক দায়বদ্ধতা।
– রাজনীতি মানে মিছিল নয়, হতে পারে উদ্ভাবনের বাস্তবায়ন।
‘সিভিল পলিটিক্স’ বা নাগরিক নেতৃত্বের সংকল্প:
ড. ইউনূস এমন এক সময়ে বিকল্প রাজনীতির কথা বলেন, যখন বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক অপারগতায় ক্লান্ত। তখন তিনি গ্রামীণ ব্যাংক মডেল, সামাজিক ব্যবসা, শিক্ষা-বিনিয়োগ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এমন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেন, যেখানে দলীয় পরিচয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সামাজিক উদ্ভাবন তিনি রাজনীতি করতে চেয়েছেন রাষ্ট্র গঠনের জন্য, রাষ্ট্র দখলের জন্য নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত বিকল্প রাজনীতি।
তাঁকে নিয়ে ভয় কেন?
রাজনৈতিক দলগুলো কেন তাঁকে ভয় পায়?
কারণ, তিনি জনগণকে সরকার ছাড়া উন্নয়ন করতে শেখান।
তিনি শেখান ব্যাংক ছাড়া ব্যাংক, দল ছাড়া নেতৃত্ব, অর্থ ছাড়া ব্যবসা।
এই শিক্ষা শুধু প্রথাগত রাজনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটা হচ্ছে দলীয় দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রাথমিক পাঠ।
ড. ইউনূস বনাম ইউটিলিটি:
রাজনীতির কাছে একজন ব্যক্তির মূল্যায়ন হয় কতটা ইউটিলিটি আছে, সে অনুযায়ী।
তিনি শ্লোগান দিতে পারছেন কি না, দল বানাতে পারছেন কি না, ভোটের হিসাব মেলাতে পারছেন কি না।
ড. ইউনূস কোনোই করেননি—তাই তাঁর চুপ থাকা রাজনৈতিক বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি যেন সমাজের নিঃশব্দ ক্রন্দনের ভাষ্য হয়ে গেছেন।
বিকল্প রাজনীতি কী হতে পারত? ড. ইউনূসের ভিশন:
১) সামাজিক ব্যবসা ভিত্তিক অর্থনীতি-
– যেখানে লাভ নয়, প্রধান লক্ষ্য থাকবে সমস্যা সমাধান।
২) তরুণ উদ্যোক্তা ও নেতৃত্ব-
– চাকরি নয়, উদ্ভাবনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়া।
নাগরিক নেতৃত্বের জাগরণ:
– জনপ্রতিনিধি নয়, জনভিত্তিক নেতৃত্ব।
রাজনীতি থেকে কল্যাণনীতির রূপান্তর:
– ক্ষমতার ভাষা নয়, নীতির ভাষা।
ড. ইউনূস নয়, ভাবনার বিপ্লব দরকার
আজকে হয়ত ড. ইউনূস রাজনীতিতে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা আছে।
সেই চিন্তা থেকেই উঠে আসছে প্রশ্ন:
– আমরা কবে নাগরিককে নেতা ভাবতে শিখব?
– কবে রাষ্ট্রব্যবস্থা হবে দল নির্ভর নয়, দায় নির্ভর?
– কবে একটি ভালো মানুষের ভাবনাও “রাজনীতি” হয়ে উঠবে, “ষড়যন্ত্র” নয়?
ড. ইউনূস ছিলেন না রাজনীতিবিদ, কিন্তু ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সর্বোত্তম উপযুক্ত:
তাঁর রাজনীতির মধ্যে ছিল অর্থনীতি, ছিল শিক্ষা, ছিল সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা; আর ছিল না কুৎসা, দলাদলি কিংবা দখলদারিত্ব।
এই দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বাংলাদেশের জন্য আশার আলো। তিনি হয়ত একদিন চলে যাবেন, কিন্তু যদি আমরা তাঁর ‘বিকল্প রাজনীতির' ভাবনা বুঝতে পারি, তাহলেই তৈরি হবে এক নতুন প্রজন্ম -যারা ভোট চেয়ে নয়, আস্থা জিতে রাজনীতি করবে।
“ভিন্নমত মানেই শত্রু নয় এবং চিন্তাবিদ মানেই ষড়যন্ত্রকারী নয়” -এই কথাগুলো যতদিন আমরা না বুঝব, ততদিন বিকল্প রাজনীতি শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।
লেখক পরিচিতি:
কলামিস্ট তৌফিক সুলতান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক & সহকারী প্রধান শিক্ষক
ভাওয়াল ইসলামিক ক্যাডেট একাডেমি, কাপাসিয়া, গাজীপুর।
প্রভাষক - বি.জে.এস এম মডেল কলেজ, মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েলফেশন লাভ অফ ওয়েলফেয়ার।
ইমেল: towfiqsultan.help@gmail.com
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি সম্পূর্ণ লেখকের মতামত। কর্তৃপক্ষ দায়ি নয়।





















