ইতিকাফ কি ও বিস্তারিত নিয়ম
২৫ মে ২০১৯, ০৭:২৯ পিএম
ছবি-প্রতিদিনের চিত্র
ইতিকাফ কি:
বিশেষ নিয়তে বিশেষ অবস্থায় আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্য সব কিছু থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়।
পবিত্র কোরআনে ইতিকাফ সম্পরর্ক কি বলা হয়েছে:
পবিত্র কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর কথা উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো। ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের সঙ্গে কী আচরণ হবে, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফকালে স্ত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করো না।
হাদিস শরিফে ইতিকাফ সম্পর্কে বলা হয়েছে:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিস ইতিকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো—
ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।মদিনায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছরই ইতিকাফ পালন করেছেন। শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও রমজানে তিনি ইতিকাফ ছাড়েননি। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান। ইতিকাফ একটি মহৎ ইবাদত। এ ইবাদত স্বেচ্ছায় পালনীয়। ইসলামী শরিয়তে বিনিময় দিয়ে ভাড়া করে ইবাদত করানোর সুযোগ নেই। টাকার বিনিময়ে ইতিকাফ করা ও করানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এভাবে ইতিকাফ করানোর মাধ্যমে মহল্লাবাসী দায়মুক্ত হয় না।
বিজোড় রাতে শবেকদরের সম্ভাবনা:
রমজান বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ দিন হলো শেষ ১০ দিন। কেননা এ দশকেই রয়েছে পবিত্র শবেকদর। বিশেষ হেকমতের কারণে শবেকদরের দিনক্ষণ ঠিক করে দেওয়া হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ইবাদতের প্রতি মনোনিবেশ করতে বলা হয়েছে। শবেকদর সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। তুমি কি জান, লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
আরবি লাইলাতুল কদরের ফারসি হলো শবেকদর। বাংলায় ভাগ্যরজনী। এটি শ্রেষ্ঠতম রাত। এ রাতের ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় শবেকদরে ইবাদত করবে, তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।
যারা এ রাতের রহমত ও বরকত থেকে বঞ্চিত, তারা সবচেয়ে হতভাগা। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এমন একটি মাস পেয়েছ, যার মধ্যে এমন একটি রজনী রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি এই পুণ্যময় রাতে বঞ্চিত থাকে, সে সমূহ কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত থাকে। সে খুবই হতভাগা, যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে।
সুতরাং এই রাতের ফজিলত লাভে সচেষ্ট হওয়া আমাদের সবার কর্তব্য। অন্তত এশা ও ফজরের নামাজ যদি জামাতের সঙ্গে আদায় করা যায়, তবু সারা রাত নামাজ পড়ার সমান সওয়াব পাওয়া যাবে। এক হাদিসে এসেছে : যে ব্যক্তি এশা ও ফজর জামাতের সঙ্গে পড়ল সে যেন সারা রাত দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ল।
শবেকদর কবে? হাদিস শরিফে এসেছে : তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাতে শবেকদর তালাশ কর।
নির্দিষ্টভাবে ২৭ রমজানের রাতকে শবেকদর বলা উচিত নয়। কেননা হাদিস শরিফে শেষ দশকের বিজোড় রাতে শবেকদর অন্বেষণ করতে বলা হয়েছে। কোনো কোনো হাদিসে রমজানের শেষ সাত দিনের কথাও এসেছে। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, কয়েকজন সাহাবি রমজানের শেষ সাত রাতে স্বপ্ন মারফত শবেকদর হতে দেখেছেন। সাহাবিদের এ স্বপ্নের কথা জানতে পেরে নবী করিম (সা.) বলেন, আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্নগুলো মিলে যাচ্ছে শেষ সাত রাতে। সুতরাং কেউ চাইলে রমজানের শেষ সাত রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে পার।
মূল কথা হলো, শেষ দশকের সব রাতেই যথাসম্ভব বেশি বেশি ইবাদত করা চাই। বিশেষত শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে রমজানের অন্যান্য রাতের তুলনায় বেশি বেশি ইবাদত, নফল নামাজ, তাসবিহ-তাহলিল ও কোরআন তেলাওয়াত করা চাই। শবেকদরের একটি বিশেষ আমল হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছি, ‘হে আল্লাহর রাসুল! যদি আমি শবেকদর পেয়ে যাই, তবে আল্লাহর কাছে কী দোয়া করব?’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘এই দোয়া পড়বে—আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাকারী এবং আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।
রমজানে প্রথম দুই দশকে ইতিকাফ:
রমজানের প্রথম দুই দশকেরও বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত আছে। তবে শেষ দশকের গুরুত্ব ও ফজিলত আরো অনেক গুণ বেশি। কেননা এ দশকেই রয়েছে পবিত্র শবেকদর। শবেকদর হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। অর্থাৎ এক হাজার মাস ইবাদত করলে যে সওয়াব হতে পারে, এই রাতের ইবাদতে তার চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। এ রাতের কারণেই পুরো রমজান তাৎপর্য ও ফজিলতপূর্ণ হয়েছে। আর পবিত্র কোরআনও অবতীর্ণ হয়েছে এই দশকের কদরের রাতে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে। অবশ্যই আমি সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়।
তাই রমজানের বিগত দিনগুলো যাদের অবহেলায় কেটে গেছে, এখনো সময় আছে তাদের নিজেকে শুধরে নেওয়ার। মুক্তির অবারিত সুযোগ পেয়েও যারা নিজেদের মুক্ত করে নিতে পারল না, তাদের চেয়ে হতভাগা আর কে?
শেষ দশকের ইতিকাফ:
রমজানের প্রথম দশক রহমতের। দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের। তৃতীয় দশক নাজাতের। প্রথম দশকে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে রহমতের বারিধারা বর্ষণ করে মাগফিরাত ও ক্ষমার উপযোগী করেন। দ্বিতীয় দশকে ক্ষমা করে তৃতীয় দশকে বান্দার জন্য নাজাতের ফয়সালা করেন। হাদিস শরিফে এ দশককে ‘ইতক্বুম মিনান নার’ বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির দশক বলা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন রমজানের শেষ ১০ রাত আসত, তখন নবী করিম (সা.) কোমরে কাপড় বেঁধে নেমে পড়তেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন। আর পরিবার-পরিজনকেও তিনি জাগিয়ে দিতেন।
শেষ দশকের ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইতিকাফ করেছেন, সাহাবায়ে কেরামও করেছেন, তাই আমাদের জন্যও ইতিকাফ করা সুন্নাত। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এরপর তাঁর স্ত্রীরাও ইতিকাফ করেছেন।এ সময় তিনি আল্লাহর ইবাদতে মসজিদে নির্জন বাস করতেন। দুনিয়াবি সব ধরনের সম্পৃক্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করতেন, ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তাঁর ইতিকাফের জন্য মসজিদে একটি তাঁবু পাতা হতো। ইতিকাফকালীন তিনি রোগী দেখতে বের হতেন না, জানাজায় যেতেন না এবং নারীদের সংশ্রব ত্যাগ করতেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজনের মতো জরুরি কিছু ছাড়া তিনি তাঁর ইতিকাফস্থল ত্যাগ করতেন না।
শেষ দশকে গুরুত্বের সঙ্গে ইতিকাফের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে।’ এরপর মানুষ তাঁর সঙ্গে ইতিকাফে শরিক হয়।
শুধু ২৭ তারিখ কিংবা শেষ তিন দিন ইতিকাফ করলে সুন্নাত আদায় হবে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, রমজানের ২৭ তারিখ শবেকদর। যেহেতু ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য শবেকদরের তালাশ, তাই যারা চাকরিজীবী তারা যদি শুধু ২৭ তারিখ অথবা শেষ তিন দিন ইতিকাফ করে তবে সুন্নত আদায় হবে? শবেকদর সম্পর্কে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও বিতর্কমুক্ত অভিমত হলো, শবেকদর শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কারো জন্য ইবাদত করা সম্ভব না হলে ২৭তম রাতে কিছুতেই উদাসীন থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে ওই দিন মাগরিব ও এশার নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে আদায় করলে হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সে-ও শবেকদরের ফজিলত পেয়ে যাবে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি এশা ও ফজর নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করে, সে যেন সারা রাত দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে।
এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ বলে থাকেন, ২৭তম রজনীকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া অবৈধ কিংবা বিদাত! অথচ এর সপক্ষে হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামদের আমল রয়েছে। হজরত শুবা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) শবেকদরের রাতে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তা সম্পর্কে অবগত আছি। (আর তা হলো ২৭তম রাত) কেননা রাসুল (সা.) এ রাতে আমাদের নামাজে দাঁড়াতে আদেশ করতেন।
অনুরূপ ধারণা পোষণ করতেন হজরত মুয়াবিয়া (রা.), হজরত ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত হাসান (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)।
যেসব কারণে ইতিকাফ ভেঙে যায়:
শেষ দশকের সুন্নাত ইতিকাফকারীর জন্য মানবীয় ও শরয়ি বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো কারণে মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ নয়, বের হলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। সুতরাং ফরজ গোসল ছাড়া গরম ও গায়ের দুর্গন্ধের কারণে গোসল করার জন্য বের হওয়া জায়েজ নেই। হ্যাঁ, যদি অতীব প্রয়োজন হয় এবং মসজিদে গোসলের সুব্যবস্থা থাকে, তাহলে মসজিদেই গোসল করবে অথবা ভেজা গামছা দিয়ে শরীর মুছে ফেলবে। আর ইস্তেঞ্জা করতে গিয়ে অজু পরিমাণ স্বল্প সময়ের মধ্যে সাবান ইত্যাদি ছাড়া স্বাভাবিক গোসল করতেও কোনো অসুবিধা নেই।
জানাজা ও রোগীর সেবা ইত্যাদির জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও ইতিকাফ ভেঙে যাবে।
ইতিকাফ অবস্থায় মেসওয়াক অথবা ব্রাশ করার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়া যাবে না। গেলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। হ্যাঁ, অজু করার জন্য বের হলে তখন মেসওয়াকও করে নেবে। শুধু মেসওয়াক বা ব্রাশ করার জন্য বাড়তি সময় যাতে নষ্ট না হয়। (ফাতাওয়ায়ে শামি, ৩/৪৩৯) এ হিসাবে ফোনে কথা বলার জন্যও মসজিদ থেকে বের হওয়ার অনুমতি নেই।
ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত। তাই কেউ যদি অসুস্থতার দরুন অপারগ হয়ে রোজা ভাঙতে হয়, তবে ইতিকাফও ভেঙে যাবে।
অসুস্থতার দরুন নিরুপায় হয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেও ইতিকাফ ভেঙে যাবে। তবে অপারগতার দরুন গুনাহগার হবে না।
কোথায় ও কিভাবে ইতিকাফ করবেন:
ইতিকাফ একটি মহৎ ইবাদত। এ ইবাদত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য স্বেচ্ছায় পালনীয়। পবিত্র রমজান মাসের শেষ ১০ দিন মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্বাদা কিফায়া। কেউ যদি রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতে চায়, তাহলে সে যেন ২০ রমজান সূর্যাস্তের আগেই ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করবে।
এক মহল্লায় একাধিক মসজিদ থাকলে প্রতিটি মসজিদে ইতিকাফ করা উত্তম। তবে তা জরুরি নয়। বরং যেকোনো মসজিদে ইতিকাফ করলে মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে যথেষ্ট।
কোনো গ্রামের মসজিদে অন্য গ্রামের লোকের ইতিকাফের দ্বারা ওই গ্রামের সবার পক্ষ থেকে ইতিকাফের সুন্নাতে মুয়াক্বাদায়ে কেফায়া আদায় হয়ে যাবে। তবে গ্রামবাসীর জন্য উচিত, তাদের মধ্য থেকে কেউ ইতিকাফে বসা।
ইতিকাফ স্বেচ্ছায় পালন করতে হবে। ইসলামী শরিয়তে বিনিময় দিয়ে ভাড়া করে ইবাদত পালন করার সুযোগ নেই। তাই কাউকে টাকার বিনিময়ে ইতিকাফ করা এবং করানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এভাবে ইতিকাফ করানোর দ্বারা মহল্লাবাসী দায়মুক্ত হতে পারবে না।
স্রাব-পায়খানাসহ মানবীয় ও শরয়ি প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে। যদি মসজিদের সীমানার ভেতরে অজুর সুব্যবস্থা না থাকে, তাহলে শুধু অজুর জন্য বের হওয়ার অনুমতি রয়েছে।
ইতিকাফকারীর জন্য মসজিদের আদবের খেলাফ কোনো কাজ করা বা মুসল্লি ও ফেরেশতাদের কষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করার অনুমতি নেই। তাই নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী মুতাকিফ ব্যক্তি বায়ু নির্গমনের জন্য মসজিদ থেকে বের হয়ে যাবে।
রমজান মাসে ইতিকাফকারী মসজিদের মুয়াজ্জিন হোক বা না হোক, বিদ্যুৎ থাকুক বা না থাকুক—সর্বাবস্থায় মসজিদের বাইরে গিয়ে আজান দিতে পারবে।
ইতিকাফকারীর জন্য জানাজা বা রোগী দেখার জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েজ নেই। তবে ইস্তেঞ্জা বা কোনো প্রয়োজনে বের হয়ে পথিমধ্যে রোগী দেখা এবং জানাজায় শরিক হওয়া জায়েজ আছে।
যে ব্যক্তি সুন্নাত ইতিকাফ শুরু করে ভেঙে ফেলেছে, সে রমজানের পর রোজাসহ এক দিন ও এক রাত ইতিকাফ করবে।
মাগরিবের পরও যদি কেউ প্রবেশ করে, তাহলে সুন্নাত ইতিকাফ হবে না, তার ইতিকাফ নফল হিসেবে গণ্য হবে।
এই ইতিকাফের শেষ সময় হলো ঈদের চাঁদ ওঠার দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তাই ২৯ রমজান বা ৩০ রমজান সূর্যাস্তের আগে যদি চাঁদ দেখা যায়, তবুও সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর মসজিদ থেকে বের হতে পারবে।
ইতিকাফকারীর জন্য প্রাকৃতিক ও শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েজ। তাই প্রস্রাব-পায়খানা, ফরজ গোসল, খাবার পৌঁছে দেওয়ার লোক না থাকলে খাবার নিয়ে আসার জন্য, ইতিকাফরত মসজিদে যদি জুমার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে জুমার নামাজ আদায় করার জন্য অন্য মসজিদে যাওয়া জায়েজ।
প্রাকৃতিক ও শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয়ে যদি প্রয়োজন শেষে আধা মিনিটও দেরি করা হয়, তাহলে এতেও ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
বাথরুম যদি মসজিদের অনেক দূরে থাকে, তাহলে প্রস্রাব-পায়খানার জন্য সেখানে যাওয়াও বৈধ।
ফরজ গোসল ছাড়া অন্য যেকোনো গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে।
এ ক্ষেত্রে বড় পাত্রের ব্যবস্থা করে মসজিদের ভেতর এমনভাবে গোসল করা যায়, যাতে গোসলের পানি মসজিদে না পড়ে কিংবা কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে নেবে।
ইতিকাফকারী একান্ত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ব্যবহার করে শেয়ার বিক্রি করতে পারবে। তবে এ ধরনের কাজে বেশি সময় দেওয়া যাবে না।
ইতিকাফের প্রকার:
ইতিকাফ তিন প্রকার। ১. সুন্নত : শেষ দশকের ইতিকাফ। ২. নফল : যেকোনো সময় সেই ইতিকাফ করা যায়। ওয়াজিব : মানতের ইতিকাফ।
ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান:
ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো বাইতুল্লাহ শরিফ। বাইতুল্লাহ শরিফের পর মসজিদে নববি। এরপর বাইতুল মাকদিস বা মুকাদ্দাস। তারপর জুমা আদায় করা হয় এমন মসজিদ। এরপর মহল্লার যে মসজিদে নামাজির সংখ্যা বেশি হয়, সে মসজিদে ইতিকাফে সওয়াব বেশি।
নারীদের ইতিকাফ:
পুরুষদের ন্যায় নারীদের জন্য ইতিকাফ সুন্নত। কিন্তু তারা ঘরে ইতিকাফ করবে। ইতিকাফের জন্য ঘরের নির্দিষ্ট নামাজঘরকে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারো নামাজের জন্য নির্দিষ্ট নামাজঘর না থাকলে নামাজের নির্দিষ্ট স্থানকে কাপড় দিয়ে ঘেরাও করে নেওয়া যেতে পারে।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষের দশকে ইতিকাফ করেছেন ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীরা ইতিকাফ করেছেন।
ইতিকাফে যেসব কাজ করা মাকরুহ:
ইতিকাফে যেকোনো অপ্রয়োজনীয় কাজই মাকরুহ। যেমন—অনর্থক গল্প করা, বিনা প্রয়োজনে বেচাকেনা করা, মোবাইলে গেম খেলা, ফেসবুকে চ্যাট করা ইত্যাদি। একান্ত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বেচাকেনা করার অনুমতি আছে।
ব্যবসায়ী মালামাল মসজিদে নিয়ে আসা মাকরুহ। যদিও একান্ত প্রয়োজনে বেচাকেনা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ইতিকাফ অবস্থায় চুপ করে বসে থাকাও কোনো ইবাদত নয়। তাই ইবাদত মনে করে চুপ করে বসে থাকাও মাকরুহ।































