রমজানের আগেই অস্থির খেজুর বাজার

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১৫ পিএম


রমজানের আগেই অস্থির খেজুর বাজার

ছবি- সংগৃহীত।

 

রোজার এক মাস আগেই ইফতারের অন্যতম আইটেম খেজুরের বাজারে আগুনের তাপ। এরই মধ্যে দাম বেড়েছে কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত। বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, পাইকারিতেই এখন দাম বাড়তি। এই অবস্থায় টিসিবির দাবি গত এক মাসে খেজুরের দাম বাড়েনি।

 

খেজুরের দাম নিয়ে টিসিবি যে দাবি করেছে, সে দাবির মিল পাওয়া যায়নি বাজারে। টিসিবি বলছে, এক মাসে খেজুরের দাম এক পয়সাও বাড়েনি। কিন্তু বাজারে কেজিতে বেড়েছে ২০০ টাকা পর্যন্ত।

 

প্রায় ৪০ দেশ থেকে বছরে আমদানি করা হয় প্রায় পাঁচ কোটি কেজি খেজুর। তবে রোজার মাসে চাহিদা কয়েক গুণ বাড়ায় খেজুর বিক্রি হয় অন্তত আড়াই কোটি কেজি বা ২৫ হাজার মেট্রিক টন।

 

রোজার আগে প্রতি বছরই খেজুরের দাম বেড়ে যায়। এবারও বেড়েছে। তবে অন্য সময়ে সাধারণ মানের যে খেজুর ১২০ টাকায় পাওয়া যায়, সেটাই এখন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়। আর উন্নত মানের মরিয়ম, মেডজুল ও আজহারে বেড়েছে কেজি প্রতি ২০০ টাকা পর্যন্ত।

 

তবে, বাজারে দাম বাড়লেও টিসিবির তথ্য বলছে, এক মাসে নতুন করে খেজুরের দাম বাড়েনি। সরকারের এই সংস্থার হিসেবে এক বছরে খেজুরের দাম বেড়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান জানান, পণ্য আমদানি স্বাভাবিক হওয়া দরকার, আর ভোক্তারা যদি রয়েসয়ে পণ্য ক্রয় করে তাহলেই রোজায় স্বাভাবিক থাকবে বাজার।

এ রকম কথার পিঠে কথা আর দাম নিয়ন্ত্রণে বাজারে মাঝে-মধ্যে অভিযান- কোনো কিছুতেই খেজুরসহ নিত্যপণ্যের বাজারে সুফল পাচ্ছে না মানুষ।

 

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর খেজুর আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর মিলিয়ে ১০ শতাংশ শুল্ক হার ছিল। অর্থাৎ ১০০ টাকার খেজুর আমদানি করলে শুল্ক-কর দিতে হতো ১০ টাকা। চলতি অর্থবছরে সেই শুল্ক হার বেড়েছে। বর্তমানে খেজুরে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর রয়েছে।

 

আজোয়া, মেডজুল, মরিয়মের মতো উন্নত মানের খেজুরে এখন শুল্কায়ন হচ্ছে প্রতি কেজি ৪ ডলার আমদানি মূল্য ধরে। তাতে কেজিপ্রতি শুল্ক-কর আদায় করা হচ্ছে ২৬৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা বাজারে খেজুর বিক্রির সময় দাম নির্ধারণে এ শুল্ক-করকেও আমদানি খরচে যুক্ত করছেন। অর্থাৎ এসব খেজুরের প্রতি কেজিতে নির্ধারিত ২৬৫ টাকা শুল্ক-কর পরোক্ষভাবে ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে।

 

এর বাইরে কিছু খেজুরের শুল্ক-কর হিসাব করা হচ্ছে প্রতি কেজি ২ ডলার ৭৫ সেন্ট আমদানি মূল্য ধরে। তাতে করভার দাঁড়াচ্ছে ১৮১ টাকা। আর কেজিতে আড়াই ডলারে শুল্কায়ন করা খেজুরে এই করভার ১৬৪ টাকা। এর বাইরে বস্তায় আসা নিম্নমানের খেজুরে করভার ৬৬ টাকা।

 

রোজার আগেই এবার বাজারে খেজুরের দাম বেড়ে গেছে। প্রতি কেজি আজোয়া খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ টাকায়। সবচেয়ে ভালো মানের আজোয়ার কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা। এ ছাড়া মেডজুল ১ হাজার ২০০, মিসরের আম্বর ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

 

বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জায়েদি, মাশরুখ মারিয়াম, নাকাল, দাব্বাস, সাফারি ও সুগাই নামের খেজুর। তিন মাস আগেও এসব খেজুরের দাম ছিল ২০০ থেকে ৬০০ টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। গত শনিবার চট্টগ্রামের বাজারে প্রতি কেজি দাব্বাস ৩৮০ টাকা, মাশরুখ ৫০০, সাফারি ৮০০, সৌদি আরবের আম্বর ৮০০, নাকাল ৩৫০ ও ছড়া খেজুর ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৮ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপনে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়; বলা হয় আমদানিকারকরা ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন। শুল্কায়ন মূল্যের ভিত্তিতে সাধারণ মানের খেজুর আমদানিতে শুল্ককর কমবে কেজিতে ৩৩ টাকা, যদিও এখন পর্যন্ত সাধারণ মানের খেজুরের কোনো চালান খালাস হয়নি।

 

রোজার আগে আগে সরকার খেজুরের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমালেও তা ‘যথেষ্ট’ মনে করছে না ফল আমদানিকারকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশন’। এই শুল্ক হ্রাসকে ‘অতি সামান্য’ হিসেবে বর্ণনা করে সংগঠনটি বলছে, যে পরিমাণ কমানো দরকার, সেই পরিমাণ কমেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও সরকার কয়েকগুণ শুল্ক দিয়ে রাখায় দাম বাড়তি।

 

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রমজানে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। অতীতে যে শুল্ক ধরা হতো, তা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থাকলেও বর্তমানে যে শুল্ক, তা বাজারমূল্য থেকে অনেক বেশি। তাই চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা হয়নি।’

 

এই ব্যবসায়ীর ভাষ্য, খেজুর আমদানিতে পিপি ব্যাগে আগের শুল্কায়ন মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ৫.৪৫ টাকা, আর বর্তমানে করা হয়েছে ৬৫ টাকা। ড্রাই কন্টেইনারে ছিল ১০.৯৩ টাকা, যা বর্তমানে ধরা হয়েছে ১৬৪ টাকা। এ ছাড়া হিমায়িত কন্টেইনারে ছিল কেজিপ্রতি ১০ টাকা, যা এখন ২৬২ টাকা। রিটেইল প্যাকেটজাত কার্টন ছিল ২১.৮৪ টাকা, যা বর্তমানে ১৮০ টাকা।

 

শুল্ক না কমালে খেজুরের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কেনা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘খেজুরে যেভাবে ডিউটি কমানোর কথা, সেভাবে তো কমেইনি, বরং আমদানির চেয়ে ৩ গুণ শুল্ক ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খেজুরের দাম এ বছর মানভেদে ৫০ থেকে ১০০ ডলার কমেছে। কিন্তু আমাদের দেশে সরকার এই পণ্যে কয়েকগুণ শুল্ক দিয়ে দাম বাড়িয়েছে।

 

শুল্ক কমানোর এই পরিমাণ ‘অতি সামান্য’ মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অথচ বর্ধিত শুল্কায়ন ও আমদানি শুল্ক কমানো হবে, সেই আশায় আমদানিকারকরা অনেক খেজুরবাহী কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পরেও পোর্টে রেখে দিয়েছেন।

 

খেজুর নিয়ে ব্যবসায়ীরা ‘বিপাকে পড়েছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘শুল্ক না কমালে খেজুর বিক্রি করতে পারব না। আর খেজুর বিক্রি করতে না পারলে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারব না।

 

 

Ads