ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিডিবি`র ট্রান্সফরমার,খাম্বা বাণিজ্য

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২২ জুন ২০২০, ১০:৩৩ পিএম


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিডিবি`র ট্রান্সফরমার,খাম্বা বাণিজ্য

ছবি- প্রতিদিনের চিত্র


উন্নয়নমূলক কাজ মানেই এক শ্রেণীর মানুষের নিজের ভাগ্যোন্নয়ন। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে 'সওদা' করেই তারা নিজেদের আখের গোছাতে হয়ে ওঠেন ব্যস্ত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজে তেমনটিই জমজমাট হয়ে উঠেছে ট্রান্সফরমার-খাম্বা বাণিজ্য। দালালদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তির ভিত্তিতেই নতুন ট্রান্সফরমার এবং খুঁটি (খাম্বা) বসানোর কাজ হচ্ছে বলে মিলেছে অভিযোগ।আর ওই টাকা প্রকল্পের কর্মকর্তাদের পকেটে ঢোকার বিষয়টি এখানে অনেকটাই 'ওপেন সিক্রেট'। বাণিজ্যের বেঘোরে স্টোর থেকে রহস্যজনক মালামাল চুরির পর লাগানো হয় সিসি ক্যামেরা!


বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প কুমিল্লা জোন-১ এর অধীনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুরনো বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। জেলা সদরে বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থার দু'টি বিভাগ ১ ও ২, সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগও এই প্রকল্পেরই আওতাধীন। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কাজের জন্যে এসেছে ৮৫টি ট্রান্সফরমার এবং ছয় হাজার খুঁটি। তন্মধ্যে ৫০টির মতো ট্রান্সফরমার এবং দুই হাজার খুঁটি বসানোর কাজও হয়ে গেছে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে মালামাল এসে পৌঁছানোর পর মে মাসে জেলায় শুরু হয় ওই প্রকল্পের কাজ।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্পে সাব ষ্টেশন বসানোসহ কুমিল্লা জোনে মোট দুুই হাজার কোটি টাকার কাজ হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু হবার পর থেকেই অভিযোগ ওঠে ট্রান্সফরমার এবং খুঁটি বিক্রির। প্রকল্পের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজ দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করছেন জেলা সদরে পিডিবি’র বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এ কর্মরত উপ-সহকারি প্রকৌশলী মশিউর রহমান। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই কাজ করলেও বর্তমানে তিনি প্রকল্প নিয়েই পুরো সময় ব্যতিব্যস্ত। দালালদের মাধ্যমে টাকা নেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধেই। কোন্ এলাকায় কতো টাকায় ট্রান্সফরমার এবং খুঁটি বসানো হয়েছে সেই খোজখবর রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিতরণ বিভাগের লাইনম্যান থেকে শুরু করে সবার মুখে মুুুখে।


ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর নতুন বাজার এলাকায় দুটি ট্রান্সফরমার ও ২৫/৩০টি খুঁটি বসাতে প্রায় তিন লাখ টাকার চুক্তি হয়। গ্রাম থেকে এই টাকা ইতিমধ্যে উঠানোও হয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গ্রামের অলি মিয়ার হাতে তারা এই টাকা তুলে দিয়েছেন। অলি মিয়া এই বিষয়ে ওয়াপদায় সবরকমের যোগাযোগ করেছেন। সরেজমিনে বিরামপুর গ্রামে গিয়ে দেখতে পাওয়া যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-নবীনগর সড়কের পাশে দুটি ট্রান্সফরমার এবং ভেতরের দিকে খুঁটি বসানোর কাজ সম্পন্ন অবস্থায়। গ্রামে এই কাজ এবং টাকা উত্তেলনে সম্পৃক্তদের একজন লোকমান জানান, নতুন বাজারের পশ্চিম পাশে মসজিদের সামনে বসানো ট্রান্সফরমারটি তাদের। ট্রান্সফরমার বসানো ছাড়াও খাম্বা এবং তার লাগানোসহ সম্পূর্ণ কাজের লেবার বিল হিসেবে তারা ৫০/৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন। এই টাকায় সব কাজ সম্পন্ন করে দেয়া হবে বলে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। তবে এই কাজে সম্পৃক্ত আরেক ইলেকট্রেশিয়ান জুয়েল মিয়া জানান, দু'টি ট্রান্সফরমার এবং প্রয়োজনীয় খুঁটি বসানো বাবদ দুই লাখ ৯০ হাজার টাকা চুক্তি হয়েছে। বেশীরভাগ টাকা তারা পরিশোধও করেছেন গ্রামের অলি মিয়ার হাতে। নতুন ট্রান্সফরমার ও খুঁটি বসানোর ব্যাপারে অলি মিয়ার সাথেই তাদের কথা হয়। বাজারের পশ্চিম পাশের ট্রান্সফরমারের জন্যে ৯০ হাজার টাকা এবং পূর্বপাশের ট্রান্সফরমারের জন্যে দুই লাখ টাকা দেয়ার চুক্তি হয় বলে জানান জুয়েল। ইতোমধ্যে  দুই লাখ টাকা তারা অলি মিয়াকে দিয়েছেন। ১৬টি খুঁটিসহ তাদের এদিকের ট্রান্সফরমারটি বসানোর টাকা সে এবং আরো ৪/৫ জন মিলে গ্রামের প্রত্যেক ঘর থেকে দুই হাজার করে তুলেছেন। স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রবাসে বসবাসকারী মোক্তার হোসেনের পিতা আবদুল হাফিজ জানান, 'এই বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। লোকমান, জুয়েল এরাই বিষয়টি ডিল করছে।' অলি মিয়া টাকা গ্রহণের কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। গ্রাম থেকে বিদ্যুতের কাজের জন্যে টাকা উঠেছে এমনটি তিনি শুনেছেন বলে তিনি জানান।


শহরের ভাদুঘর কাঞ্চনপুর, শহরতলীর বিরাসার জোড়া কবরস্থানের কাছে ট্রান্সফরমার বসানো হয় টাকার বিনিময়ে। এভাবে জেলার সরাইল এবং আশুগঞ্জ উপজেলা এলাকাতেও টাকা নিয়ে ট্রান্সফরমার-খুঁটি বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে এই টাকা নেয়া হচ্ছে। তবে উপ-সহকারি প্রকৌশলী মশিউর রহমান টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা। এতো জায়গায় কাজ হচ্ছে, কোথায় কে কি বললো, মানুষের মুখতো আটকানো যাবেনা।'  প্রকল্পের কাজের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। নিজের দায়িত্বের বিষয়ে বলেন, 'প্রকল্পের কাজের প্রয়োজন হলে আমি শাটডাউন দেই। লোকজন ঠিকভাবে কাজ করছে কি না সেটি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তদারকি করি।'


এদিকে সম্প্রতি ঘটে এই প্রকল্পের কয়েক লাখ টাকার মালামাল চুরির রহস্যজনক ঘটনা। এ বিষয়ে সদর মডেল থানায় ১৫ মে দেয়া হয় একটি এজাহার। যাতে ৩০ এপ্রিল থেকে ১৩ মে’র মধ্যে চুরির ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়। ভাণ্ডারে ৬ নং গোদামে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের মালামাল রক্ষিত ছিলো। এজাহারে বলা হয়, ৩০ এপ্রিল বিকেল তিনটায় ওই গোদাম সিলগালা করার পর ১৩ মে সকাল সাড়ে নয়টায় গোদাম খুলে মালামাল চুরি হয়েছে বলে ভাণ্ডার রক্ষক জাবেদ রহিম দেখতে পান। চুরি যাওয়া প্রকল্পের মালামালের মধ্যে রয়েছে দুই হাজার ৯৬৩টি ১২০ আর.এম কপার ক্যাবল টারমিনাল লাগ। যার মুল্য দুই লাখ ৭৮ হাজার ৫২৫ টাকা। এক লাখ ৭৪ হাজার ৪২৪ টাকা মুল্যের দুই হাজার ৫৬৫টি ৯৫ আর.এম কপার ক্যাবল টারমিনাল লাগ ও ৫৫ হাজার টাকা মুল্যর ১০০ মিটার ৯৫ আর.এম পিবিসি কপার ক্যাবল । এছাড়া বিতরন ও বিক্রয় বিভাগের নিজস্ব ২৬ হাজার ৪৮ টাকা মুল্যের ৫৯২ টি ৯৫ আর.এম কপার ক্যাবল টারমিনাল লাগ, ১৪ হাজার ৫০ টাকা মুল্যের দুইটি হাইড্রোলিক কম্প্রেসার মেশিন, ১৮ হাজার টাকা মুল্যের দুই সেট করে রিং ও ডাল রেঞ্জ, ১৫ হাজার ৮৪০ টাকা মুল্যের ১৪৪টি ষ্টিলের বিব কক, তিন হাজার ১৫০ টাকা দামের ২১টি স্টপ কক, তিন হাজার ৮৪০ টাকার ৩২টি হান্ট ফ্রেম,তিন হাজার ৯০০ টাকার,২৬টি কাটিং প্লায়ার্স ও ১৮শ' টাকা দামের ১২টি স্লাই রেঞ্জ। আনসারের পাহাড়া রেখেই হয় এই মালামাল চুরি। থানায় এজাহার দেয়ার ক’দিন পরই অন্য এক গোদামে মালামাল পাওয়া গেছে বলে প্রচারও করা হয়।


বিক্রয় ও বিতরন বিভাগ-১ এর আনসার ক্যাম্প ইনচার্জ মাহফুজুর রহমান জানান, 'যেখান দিয়ে চুরি হওয়ার কথা ওইদিকে কলাপসিবল গেইট ও সার্টার ঠিক রয়েছে। তারা (পিডিবি’র কর্মকর্তা-কর্মচারী) চুরির অভিযোগটি প্রমাণ করতে পারেননি। ক'দিন পর বললেন, অন্য গোডাউনে তারা মালামাল রেখেছেন। ভুলে তারা চুরির কথা বলেছেন বলে জানান। তারা কি মাল আনেন বা বের করে নেন, এসবের কোনটাই আমাদের জানান না।' ভাণ্ডার রক্ষক জাবেদ রহিম বলেন, 'দরজা ফাঁকা দেখে আমি মনে করেছিলাম চুরি হয়েছে। পরে অন্য গোডাউনে মালামাল পাওয়া গেছে। তবে এবিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। থানা পুলিশও ঘটনার তদন্ত করছে।' বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হান্নান বলেন, 'এই কাজের সঙ্গে আমাদের কোনোরকমের সম্পর্ক নেই। কাজটি শেষ হবার পর আমরা সেটি বুঝে নেবো।'

Ads