খাগড়াছড়ির সবুজ অরণ্যে ইটভাটার বিষাক্ত দাপট: পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি


খাগড়াছড়ির সবুজ অরণ্যে ইটভাটার বিষাক্ত দাপট: পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলাজুড়ে সবুজ পাহাড় ও উর্বর কৃষিজমিতে বেআইনি ইটভাটার দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য এখন বিপর্যস্ত। ইটভাটার চিমনির কালো ধোঁয়া এবং বনের কাঠ পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ক্ষতি উদ্বেগজনক। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের অভিযানে এসব ভাটার অবৈধ কার্যক্রম উঠে এসেছে।

ইটভাটা নির্মাণের জন্য পাহাড় কেটে সমান করা হয়েছে এবং উর্বর কৃষিজমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়েছে। ভাটাগুলোর অধিকাংশে পোড়ানো হচ্ছে পাহাড়ি বনাঞ্চলের কাঠ। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এসব ভাটার কারণে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

খাগড়াছড়িতে ইট প্রস্তুত ও ভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন মানা হচ্ছে না। জেলার ৩৮টি ভাটার মধ্যে অধিকাংশ লাইসেন্সবিহীন। চিমনির উচ্চতা ১২০ ফুট থাকার কথা থাকলেও অনেক ভাটায় ৪০ ফুটের কম উচ্চতার টিনের চিমনি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া স্থানীয় গ্রামবাসীর জন্য শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গুইমারায় মদিনা ইটভাটায় সরেজমিনে দেখা গেছে, কাঠ পোড়ানোর জন্য স্থানীয়ভাবে পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভাটার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালিকরা সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাটিরাঙা উপজেলায় ফাইভ স্টার ইটভাটায় সস্তা মজুরিতে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। দীঘিনালার কুজেন্দ্র মল্লিকা মডেল কলেজের পাশে অবস্থিত কর্ণফুলী ব্রিকসও আইন লঙ্ঘন করে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানের পাশেই এসব ভাটা স্থাপন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

ইটভাটার কারণে স্থানীয় রাস্তা এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীঘিনালার বোয়ালখালি এলাকায় কর্ণফুলী ব্রিকস ও এসএন্ডবি ব্রিকসের জন্য ফসলি জমি ধ্বংস করা হয়েছে। ইট ও কাঠ পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়কগুলো ভেঙে গেছে এবং এলাকায় ধুলোর আধিক্য বেড়েছে।

রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়নের দাতাপাড়া এলাকায় অবস্থিত চারটি ইটভাটায় কৃষিজমি নষ্ট করা হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এ ভাটাগুলো থেকে সৃষ্ট ধুলা এবং বায়ুদূষণ শিশু ও বয়স্কদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এছাড়া ছড়ার পানি দূষণের কারণে স্থানীয় কৃষি এবং মাছ চাষ ব্যাহত হচ্ছে।

কেবিএম ব্রিকসের মালিক মো. রাকিব জানান, “পার্বত্য এলাকায় আইন মেনে ইটভাটা পরিচালনা করা কঠিন। স্থানীয় উন্নয়নের জন্য ভাটা চালানো হচ্ছে।”

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান জানান, “বনের কাঠ পোড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত বছর ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।” তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের খাগড়াছড়িতে কোনো কার্যালয় না থাকায় তদারকি কার্যক্রমে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে।

ইটভাটাগুলোর বেআইনি কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব ভাটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড় ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে জানান পরিবেশবাদীরা।

 

Ads