চীন–বাংলাদেশ কৃষি সম্পর্ক শক্তিশালী করতে ‘সার’ একটি কৌশলগত উপাদান- উ জিয়ানবো
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:৩০ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি কৃষি এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবিকা রক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৃষির ভূমিকা অনস্বীকার্য বললেন- গ্রিন অ্যান্ড স্মার্ট এনার্জি অর্গানাইজেশনের সেক্রেটারি জেনারেল উ জিয়ানবো।
উ জিয়ানবো আরো বলেন- দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে ধান, সবজি ও আলু কৃষি উৎপাদনের মূলভিত্তি গঠন করে। ধান, সবজি ও আলু বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের মূল স্তম্ভ। উচ্চ জনঘনত্ব ও সীমিত আবাদযোগ্য জমির বাস্তবতায় স্থিতিশীল ফলন ধরে রাখতে দক্ষ, সুষম ও পরিবেশবান্ধব সার ব্যবহারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন- উদ্ভিদের অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানগুলোর মধ্যে পটাশ ও ফসফেট সার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পটাশিয়াম ফসলের চাপ সহনশীলতা বাড়ায়, ফলনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং গুণগত মান উন্নত করে। অন্যদিকে ফসফরাস শিকড়ের বিকাশ, প্রাথমিক বৃদ্ধি এবং দানা গঠনের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশে ধানভিত্তিক নিবিড় চাষ ব্যবস্থায় ডিএপি (DAP) ও টিএসপি (TSP) চাষের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়, যা শিকড়ের দৃঢ়তা নিশ্চিত করে এবং সমানভাবে ফসল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। ফলে ফলন স্থিতিশীলতা ও মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনায় ফসফেট সার অপরিহার্য। ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা পূরণে চাষাবাদ আরও নিবিড় হওয়ায় মিউরিয়েট অব পটাশ (MOP), ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (DAP) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (TSP) কেবল উৎপাদনশীলতার জন্যই নয়, দীর্ঘমেয়াদি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।
তিনি উল্লেখ করেছেন- বাংলাদেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থাযপনায় উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতার কথা। দেশটিতে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন সার ব্যবহার করে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। যদিও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মোট সরবরাহে অবদান রাখে, তা ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে—বিশেষ করে পটাশ ও ফসফেটভিত্তিক সারের ক্ষেত্রে—অপর্যাপ্ত। বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই ভূমি ব্যবহারে নীতিগত উৎসাহের কারণে ২০২৫–২০২৯ সময়কালে সার চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই কাঠামোগত নির্ভরতা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকার একটি তুলনামূলকভাবে পরিণত ক্রয়ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দরপত্র ও সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তির আওতায় সার আমদানি করা হয়, যাতে মৌসুমি সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। এমওপি ছাড়াও প্রধান রোপণ মৌসুমের আগে বিপুল পরিমাণ ডিএপি ও টিএসপি আমদানি করা হয়, যা জাতীয় ফসল পরিকল্পনায় ফসফেট সারের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০টি সার আমদানিকারক দেশের মধ্যে স্থান পায়, যেখানে মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি।
উ জিয়ানবো বলেন- এই প্রেক্ষাপট কেবল বাণিজ্যের জন্য নয়, বরং আরও গভীর ও কৌশলগত সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করে- বিশেষ করে চীনের সঙ্গে। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার ও কৃষি উপকরণ উৎপাদক দেশ, যেখানে পটাশভিত্তিক সার, ডিএপি, টিএসপি, যৌগিক সার ও ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প ইকোসিস্টেম রয়েছে। সরবরাহ সক্ষমতার পাশাপাশি, সার প্রকৌশল, জ্বালানি-সাশ্রয়ী উৎপাদন প্রযুক্তি এবং সবুজ উৎপাদন মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিজিটাল কারখানা ব্যবস্থাপনায় চীনের ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সার সহযোগিতা কেবল আমদানি নিশ্চিত করার বিষয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৃষি স্থিতিশীলতা জোরদারের একটি কৌশল বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে চীনের জন্য বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও নীতিগতভাবে সমর্থিত বাজার, যেখানে পুরো মূল্যশৃঙ্খল জুড়ে সহযোগিতা বিস্তৃত হতে পারে। এই পারস্পরিক পরিপূরকতা কয়েকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে।
দু’দেশের জন্য কিছু পরিকল্পনা-
প্রথমত, ডিএপি ও এমওপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি বাজারের স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা কমিয়ে সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। নির্ধারিত পরিমাণ ও মূল্য কাঠামো উভয় দেশের জন্যই লাভজনক এবং জাতীয় খাদ্য উৎপাদন পরিকল্পনায় সহায়ক।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্লেন্ডিং কারখানা যৌথ মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যৌগিক সার বা পটাশ ব্লেন্ডিং প্ল্যান্টে যৌথ বিনিয়োগ পরিবহন ব্যয় কমাবে, প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করবে এবং দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি স্থানীয় মাটি ও ফসলের উপযোগী, পরিবেশবান্ধব সার উৎপাদন সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, সার সহযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই কৃষিযান্ত্রিকীকরণ ও নির্ভুল কৃষির (precision farming) সঙ্গে যুক্ত। সার প্রয়োগ যন্ত্র, মাটির পুষ্টি পরীক্ষা এবং ড্রোনভিত্তিক ছিটানো প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রগতি বাংলাদেশে সারের ব্যবহার দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। যন্ত্রপাতি ও কৃষি পরামর্শ সেবার সঙ্গে সারকে একীভূত করলে কৃষকরা কম অপচয়ে বেশি ফলন পেতে পারবেন, যা পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে সহায়ক হবে।
চতুর্থত, পরিবহন ও বিতরণ অবকাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক সংরক্ষণাগার, গুদাম ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ মৌসুমি চাহিদার সময় সরবরাহ দক্ষতা বাড়াতে এবং সার প্রাপ্যতার বিলম্ব কমাতে সহায়তা করবে।
উ জিয়ানবো সর্বশেষ বললেন- সার কেবল একটি কৃষি উপকরণ নয়; এটি শিল্প সক্ষমতা ও খাদ্যনিরাপত্তার মধ্যে একটি কৌশলগত সেতুবন্ধন। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে বিস্তৃত সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে সারকে ব্যবহার করলে চীন ও বাংলাদেশ এমন একটি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে, যা কৃষি আধুনিকায়নের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও সবুজ উন্নয়নকে এগিয়ে নেবে। এই সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য একটি অধিক স্থিতিশীল ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ভবিষ্যৎ গঠনে অবদান রাখবে।


























