ইরান ইস্যুতে দ্বন্দ্বে ন্যাটোতে ভাঙনের সুর: স্পেনকে বহিষ্কারের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
ইরান ইস্যুতে মার্কিন সামরিক অভিযানে সরাসরি সমর্থন না দেওয়ায় উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর (NATO) ভেতরে এক চরম অস্থিরতা ও কূটনৈতিক সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তখন নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্পেনকে ন্যাটো থেকে বহিষ্কার বা সদস্যপদ স্থগিত করার একটি নজিরবিহীন প্রস্তাব উত্থাপন করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইল বার্তার সূত্র ধরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর খবরটি প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সেই ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্পেনের মতো দেশগুলোকে কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন যারা সংকটের সময়ে জোটের মূল স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করছে। বিশেষ করে স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে তাদের প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনে সদস্যপদ স্থগিত করার মাধ্যমে একটি কঠোর বার্তা দিতে চায় ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য আকাশপথ ব্যবহার, সামরিক ঘাঁটি সুবিধা প্রদান এবং ওভারফ্লাইট অধিকার নিশ্চিত করা একটি ‘ন্যূনতম দায়িত্ব’। স্পেন তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামরিক ঘাঁটি—‘নেভাল স্টেশন রোটা’ এবং ‘মোরন এয়ার বেস’ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আসলেও সাম্প্রতিক ইরান হামলার প্রেক্ষাপটে মার্কিন বাহিনীকে তা ব্যবহার করতে দিতে সরাসরি মানা করে দিয়েছে। মূলত এই ‘অসহযোগিতা’র কারণেই পেন্টাগন স্পেনের বিরুদ্ধে এমন চরম ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
ইরান ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতা শুরু হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মিত্রদের ওপর ক্ষুব্ধ হন।
ট্রাম্প দীর্ঘ দিন ধরেই দাবি করে আসছেন যে, ন্যাটো একটি ‘ওয়ান-ওয়ে স্ট্রিট’ বা একতরফা পথে পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র তার বিশাল সামরিক শক্তি ও অর্থ ব্যয় করে পুরো বিশ্বকে তথা মিত্রদের সুরক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু বিনিময়ে মিত্ররা কিছুই করছে না।” ট্রাম্প মনে করেন, বিপদের সময় মিত্ররা যদি তাদের সম্পদ ও ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেয়, তবে সেই জোটের কোনো কার্যকারিতা নেই। স্পেনের এই পদক্ষেপকে তিনি মার্কিন জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন।
পেন্টাগনের এই চরম প্রস্তাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্পেনের রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ অত্যন্ত ধীরস্থির কিন্তু দৃঢ়তার সাথে এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সানচেজ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, স্পেন আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের সামরিক তড়িৎ সিদ্ধান্তে জড়াবে না।
সানচেজ বলেন, “স্পেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমরা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সেই কাঠামোর মধ্যেই আমাদের মিত্রদের সাথে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।” পেন্টাগনের ইমেইল নিয়ে তিনি বলেন, কোনো অনানুষ্ঠানিক ইমেইল বা ফাঁস হওয়া বার্তার ভিত্তিতে স্পেন তার পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করবে না। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান জানায়, তবেই স্পেন সরকার সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ বা আলোচনা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার এই প্রস্তাব যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফাটল হিসেবে চিহ্নিত হবে। এর আগে তুরস্ক বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন চললেও কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে সরাসরি বহিষ্কারের প্রস্তাব আগে কখনো এভাবে আসেনি।
স্পেনের ‘রোটা’ এবং ‘মোরন’ ঘাঁটি দুটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের সুযোগ হারালে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। অন্যদিকে, স্পেনকে বাদ দিলে ইউরোপের অন্যান্য ছোট দেশগুলোর মধ্যেও মার্কিন আধিপত্য নিয়ে ভীতি ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে আটলান্টিকের দুই পারের দুই মিত্র দেশ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে মরিয়া, অন্যদিকে স্পেন তার সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক নীতি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। পেন্টাগনের এই প্রস্তাব কি কেবলই চাপের কৌশল, নাকি সত্যিই ন্যাটোতে এক বড় ধরনের রদবদল ঘটতে যাচ্ছে—তা দেখার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায় এখন ওয়াশিংটনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে।


























