হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, বিশ্ববাজারে তেলের দামে রেকর্ড লাফ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১১ জুন ২০২৬, ১০:৪৬ এএম


হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা, বিশ্ববাজারে তেলের দামে রেকর্ড লাফ

 

ন্তর্জাতিক ডেস্ক, প্রতিদিনের চিত্র: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ইরানের একাধিক কৌশলগত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যার জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এক অভূতপূর্ব যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ জবাবে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সব ধরনের নৌযান ও তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে যে, বুধবার গভীর রাতে চালানো এই ব্যাপকভিত্তিক হামলাটি ছিল মূলত ‘ইরানের অযৌক্তিক ও অব্যাহত আগ্রাসনের’ একটি দাঁতভাঙা জবাব। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, মার্কিন স্বার্থে আঘাত আসলে তারা আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।
অন্যদিকে মার্কিন হামলার পরপরই তীব্র পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তারা দাবি করেছে যে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি শেখ ইসা বিমানঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম ও আহমাদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিতে তারা একঝাঁক বিধ্বংসী ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার স্টেশনসহ অন্তত ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে।

একই সাথে মার্কিন রণতরীর পাহারায় থাকা সত্ত্বেও ‘অবৈধভাবে’ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করায় দুটি বিশালাকার তেলবাহী জাহাজে ইরান সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বাহিনী জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা দিচ্ছে বলে ওয়াশিংটন যে দাবি করেছিল, তাও শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।

ইরানের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত দ্বীপ কেশম, হেনগাম এবং প্রধান বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস, মিনাব ও সিরিক শহরের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলীয় কারগান শহরে বেশ কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ অন্তত দুজন বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়াও রাজধানী তেহরানের পশ্চিমাঞ্চল ও ফার্স প্রদেশেও মধ্যরাতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার বিকট শব্দে নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এই চরম উত্তেজনাকর ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড খাতা’ম আল-আনবিয়া আজ বৃহস্পতিবার এক জরুরি ও কঠোর বিবৃতিতে বড় ঘোষণা দিয়েছে। তারা জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত এপ্রিল মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সংবেদনশীল যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বারবার ও চরমভাবে লঙ্ঘন করায় ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ হরমুজ প্রণালিকে সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ, বেসামরিক নৌযান এবং তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ অঞ্চল হিসেবে সিলগালা করে দেওয়া হলো।

ইরানি সামরিক কমান্ড বিশ্ববাসীকে চরম সতর্কবার্তা দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা যদি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিংবা জোরপূর্বক ওই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ধৃষ্টতা দেখায়, তবে ইরানি কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী সেই জাহাজের ওপর সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের গোলা বর্ষণ করে তা ডুবিয়ে দেবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও পরিবাহিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশই এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে ওমান উপসাগর ও আরব সাগর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে। যার ফলে এই পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক খবর ছড়িয়ে পড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক মারাত্মক সুনামি আঘাত হেনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম একলাফে ব্যারেলে ২.৩০ ডলারেরও বেশি বেড়ে ৯৫.৪০ ডলারে এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৯২.৩৯ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় এবং হরমুজ প্রণালির এই অবরোধ যদি দ্রুত তুলে নেওয়া না হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। এর ফলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ডেকে আনবে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

 

Ads