‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ থেকে ‘ইউনূস ম্যাজিক’ শব্দগুচ্ছের কবলে দেশের অর্থনীতি
০৭ মে ২০২৫, ১২:১৫ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল সম্প্রতি প্রকাশিত এক কলামে লিখেন আওয়ামী লীগের আমলে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ কিংবা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এর মতো শব্দগুচ্ছের কবলে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইউনূস ম্যাজিক’, ‘নতুন বন্দোবস্ত’ কিংবা ‘সংস্কার’ শব্দগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থনীতির বলয়ে।
তিনি লিখেছেন, ১৯৯৩ সালে ‘দ্য ইস্ট এশিয়ান মিরাকল’ নামের এক প্রকাশনা করে বিশ্বব্যাংক।
সেখানে সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়া— এদের দ্রুত উন্নতিকে ‘মিরাকল’ বা ‘বিস্ময়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের নীতিনির্ধারক ড. সেলিম জাহানের কাছে তিনি ‘মিরাকল’ শব্দের ব্যাখ্যা চান। ড. সেলিম জাহান তাকে বলেন, ‘এখানে মিরাকল দেখলে কোথায়? সবটাই তো তাদের কর্মের সুফল।’ দেশগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সুশাসন নিশ্চিত করায় তাদের এই উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও লিখেন, দেশের গণমাধ্যমগুলো বলছে— এই সরকারপ্রধান নাকি অর্থনীতির ম্যাজিক শুরু করেছেন। তাতে অর্থনীতির সব কটি সূচক নাকি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কেউ বলছে, বিশ্বের ‘আশার বাতিঘর’ হবে বাংলাদেশ। আবার কেউবা বলছে— ম্যাজিক নাকি টর্নেডোর আকার ধারণ করেছে।
ফলে কমে গেছে বিদেশমুখিতা, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব। দেশের গভর্নর বলেছেন, বাংলাদেশের নাকি আইএমএফের ঋণের আর প্রয়োজন নেই।
তিনি লিখেছেন, এতগুলো বিস্ময়কর সংবাদ শুনে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ‘বাংলাদেশের কোথাও কি স্বর্ণখনি পাওয়া গেল, যার খবর আমি রাখিনি?’ অবশেষে কোথাও স্বর্ণখনির সন্ধান না পেয়ে বুঝে নিলাম, এ হচ্ছে সরকারের তুষ্টিসাধক কিছু সংবাদমাধ্যমের পুরোনো অভ্যাস—নতুন বোতলে পুরোনো শুরার জোগান দেওয়ার কসরত। আওয়ামী আমলে এদের জোগান অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এখন ভিন্নরূপে এদের উত্থান কেন হচ্ছে।
অর্থনীতিতে বায়বীয় কথাবার্তা বিপজ্জনক।
ড. বিরূপাক্ষ পাল লিখেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা ছিল খেলাপি ঋণ, যার বিন্দুমাত্র উন্নতি সাধিত হয়নি। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণের ১৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এটি হয়েছে ২০ শতাংশের ওপর। গভর্নরকে ধন্যবাদ যে তিনি প্রকৃত খেলাপির চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী আমলের লুটেরাবান্ধব হিসাববিদ অর্থমন্ত্রীর মতো ১০০ টাকার খেলাপিকে ৫ টাকা দেখানোর চেষ্টা করছেন না।
তিনি আরো লিখেন, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ, যা আগের বছরের একই কালপর্বের প্রায় অর্ধেক। বিদেশি বিনিয়োগ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৮২৪ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছর একই কালপর্বে ছিল এক বিলিয়ন ডলারের ওপর। বেকারত্ব বাড়ছে এবং মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে দৌড়ে কুলাতে পারছে না। তাই মানুষ সঞ্চয় ভাঙিয়ে খাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নেট বিক্রয় হয়েছে ঋণাত্মক ৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪–২৫ সময়ের জুলাই-ফেব্রুয়ারি কালপর্বে পুঁজিপণ্যের আমদানি কমে গেছে ২৫ শতাংশ। এতে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা কমে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে গত ৩৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এখানে কোনো ‘ম্যাজিক’ কাজ করছে না।
অর্থনীতির এই অধ্যাপক লিখেছেন, পত্রিকাগুলোতে খুব একটা ভুয়া রিপোর্ট ছাপা হয় না। কিন্তু ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে আজকাল ফালতু রিপোর্ট ছাড়া হচ্ছে, যেখানে ন্যূনতম সম্পাদকীয় তদারকি ও পেশাদারত্ব বজায় রাখা হচ্ছে না। ফলে মানুষ অর্থনীতি বিষয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, নতুন করে এ বছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ অতিদরিদ্র হবে। জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে হবে প্রায় ২৩ শতাংশ, যা এত দিনের ক্রমহ্রাসমান প্রবণতার এক বিপরীত স্রোত। সামাজিক শান্তির বিষয়টি আমাদের করিতকর্মা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাই ভালো বলতে পারবেন।
ড. বিরূপাক্ষ পাল লিখেছেন, জাতীয় জীবনের এসব সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ না করে শুধু রিজার্ভ বাড়লেই কী করে ‘ম্যাজিক’ শুরু হয়ে যায়, তা বোঝা গেল না। রিজার্ভ একটি অনুষঙ্গ বা নির্দেশক। জাতির চূড়ান্ত প্রাপ্তির কোনো বিষয় নয়। জাতি সবশেষে ভাগ করে নেয় জিডিপি, মানবিক মূলধন, নিরাপত্তা ও ক্ষীয়মাণ দারিদ্র্যের মাধ্যমে জীবনযাত্রার উন্নতি। অন্তত সেখানে ম্যাজিকের কিছু দেখা যাচ্ছে না।


















