৩৩ হাজার কেভি বৈদ্যতিক তারের জন্য লাউয়াছড়া উদ্যান হুমকির মুখে
৩০ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪১ পিএম
ছবি- প্রতিদিনের চিত্র।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বনাঞ্চল দিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের ৩৩ হাজার কেভি প্রধান বিদ্যুৎ লাইন চলে গেছে। সড়ক ও রেলপথের মতো বিদ্যুৎ লাইনও এ বনের স্তন্যপ্রায়ী বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি। প্রতি বছর বিদ্যুতায়িত হয়ে অনেক বন্যপ্রাণী আহত ও মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে ইতিপূর্বে ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন)-এর সভাপতিত্বে ২০১৬ সালের ২ আগস্টের সভার সিদ্ধান্তে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বনাঞ্চলের ভেতরের ৩৩ হাজার কেভি বিদ্যুৎ লাইন ও তৎসংলগ্ন কিছু এলাকায় তারের ওপর আবরণ বা তাপ অপরিবাহী কভার লাগানোর জন্য মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজারকে পত্র দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার এ পত্রটি দিয়েছেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী।
লিখিত পত্রে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী উল্লেখ করেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ১৬৭ প্রজাতির বৃক্ষ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্য প্রজাতির প্রাণী, ৫৯ প্রজাদির সরীসৃপ (২৯ প্রজাতির সাপ, ১৮ প্রজাতির লিজার্ড, ২ প্রজাতির কচ্ছপ), ২২ প্রজাতির উভচরসহ অসংখ্য প্রজাতির বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র এ লাউয়াছড়া বনাঞ্চল।
লাউয়াছড়া উদ্যানের অভ্যন্তরসহ আশপাশের বিদ্যুতায়িত এলাকায় ৩৩ হাজার কেভি হাই ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনে কোনো আবরণ না থাকায় প্রায় প্রতি মাসে ২/১টি অতি মূল্যবান স্তন্যপ্রায়ী বন্যপ্রাণী যেমন বিরল ও বিপন্ন উল্লুক, মুখপোড়ো হনুমান, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর ইত্যাদিও বনাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বিচরণকালে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে আহত ও নিহতের ঘটনা ঘটছে।
ডিএফ মো. রেজাউল করিমের বর্ণনায়, সাম্প্রতিককালে গত ৯ এপ্রিল ২০২১ গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্ট এলাকায় ১টি লজ্জাবতী বানর, ১৮ জুন ২০২১ মুসলিমপাড়া রামনগর এলাকায় ১টি চশমাপরা হনুমান, ১৬ জুলাই ২০২১ কালাছড়া বনবিট অফিসের সামনে ১টি মুখপোড়া হনুমান, ২৪ জুলাই ভিক্টোরিয়া স্কুলের সামনে ১টি এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১টি বানর বিদ্যমান বৈদ্যুতিক তারে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছে। এভাবে প্রতিনিয়ত বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীসমূহের মৃত্যু হতে থাকলে একসময় এসব বিরল ও বিপন্ন প্রাণী এ বনাঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাতে বনের জীব-বৈচিত্র্যের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও আরো জানান, উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বসবাসরত লোকালয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানকালে এ বন বিভাগ থেকে বাঁধা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে বন আইন ১৯২৭ (সংশোধিত ২০০০) অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, লাইন টানা ও বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই মর্মেও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল কার্যালয়ে পত্র পাঠানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লাউয়াছার বণ্যপ্রাণী ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় এ বনের ভেতরের ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ৩৩ হাজার কেভি প্রধান বিদ্যুৎ লাইনের তারের রাবারের আবরণ বা তাপ অপরিবাহী কভার স্থাপনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্তৃপক্ষকে জোর অনুরোধ করা হয়েছে।
সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ পত্রের অনুলিপি প্রধান বন সংরক্ষক ঢাকা, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, লাউয়াছড়া বনের ভেতর মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে দেওয়া বৈদ্যুতিক লাইনে তারে রাবারের আবরণ দেওয়া আছে। বাকি লোকালয়ে তারে নিরাপত্তা আবরণ দেওয়া হয়নি।
লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলাপত্মী এ বনের ভেতরের ৩৩ হাজার কেভি বিদ্যুৎ লাইন এ বনের স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য হুমকির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, অবিলম্বে এ বৈদ্যূতিক লাইনের তারে নিরাপত্তা আবরণ দেওয়া অতীব জরুরি ও উচিত।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. জিয়াউর রহমান বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পত্র প্রাপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।





















