উচ্চ ফলনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার
রাজা ধান চাষে নিঃস্ব কৃষক
০১ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫১ এএম
ব্র্যাক-১৮ রাজা ধান লাগিয়ে কৃষক রফিকুল ইসলাম ৮০ শতাংশ ধান পুড়ে আজ সে নিঃস্ব। ছবিটি আক্কেলপুর উপজেলার আবাদপুর গ্রাম থেকে তোলা। ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি
উচ্চ ফলনের আশায় আমন মৌসুমে ‘রাজা ধান’ লাগিয়েছিলেন জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার কৃষকরা। কিন্তু সেই আশাই এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। বীজ কোম্পানির আশ্বাসে যে ব্র্যাক-১৮ রাজা ধান চাষ করেছিলেন তারা, সেই ধান এখন মাঠে শুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে খড়ের মতো। চোখের সামনে পরিশ্রমের ফল ধ্বংস হতে দেখে হতাশ, দিশেহারা ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা।
আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের আবাদপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম এই রাজা ধান চাষ করে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল, এই ধান বিক্রি করে ছেলের লেখাপড়ার খরচ আর মা-বাবার চিকিৎসা করব। দোকানদার বলেছিল, এই ধান নাকি খুব ভালো ফলন দেবে, গাছও হবে শক্ত। ধান লাগানোর পর গাছ সতেজ ও শীষভরা ছিল। বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ২৭ মন হওয়ার কথা থাকলেও এখন পুরো জমির ৮০ শতাংশ জায়গায় শুধু শুকনো ধানের গাছ। সব শেষ হয়ে গেছে।’
রফিকুলের মতো একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন রামশালা, কাঁঠালবাড়ী, ভিকনী ও পশ্চিম আমুট্ট সংলগ্ন খাদাইল মাঠের অনেক কৃষক। তারা সবাই ‘রাজা ধান’ নামের একই জাতের বীজ ব্যবহার করেছিলেন। শুরুতে চারা গাছ ছিল সতেজ, পুষ্ট ও শীষভরা।
কৃষকরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন—এই আমন মৌসুমে হয়তো কিছুটা লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু সময় গড়াতেই সেই সবুজ মাঠে নামে অন্ধকারের ছায়া। প্রথমে কিছু গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, এরপর গোড়া থেকে শুকিয়ে যেতে থাকে। কয়েক দিনের মধ্যেই বেশিরভাগ জমির ধানগাছ মরে যায়।

কৃষক রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে আরও বলেন, ‘কলেজ বাজার থেকে উচ্চ ফলনের আশায় মজিবর বীজ ভান্ডার থেকে কিনেছিলাম ব্র্যাক-১৮ আমন মৌসুমের রাজা ধান বীজ। ধান লাগানোর পর গাছ সতেজ ও শীষভরা ছিল। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই গাছ শুকিয়ে মরে যেতে শুরু করে। দোকানদারের পরামর্শে নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন মাঠে কোনো গাছ বাঁচেনি, উল্টো সব মরে গেছে।’

কৃষক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ২৭ মন ধানের আশায় রাজা বাবু বীজ কিনেছিলাম। ধান লাগানোর পর এমিস্টার টপ, এনসিপিওসহ বিভিন্ন কীটনাশক দিয়েছি। দেড় বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন ধানের গাছ পুড়ে যাওয়ার মতো শুকিয়ে গেছে, আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। জমিতে এমন অবস্থা যে ব্যাঙও যাবে না। রাজা ধান লাগিয়ে আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। ইউএনও বরাবর অভিযোগ করেছি।’
তিনি জানান, ‘শুধু আমি নই, ভিকনী গ্রামের কৃষক মতিন মিয়াও ৭ বিঘা জমিতে একই ধান লাগিয়ে একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন। ৭৫ হাজার টাকা খরচ করে আজ তিনি নিঃস্ব ও ঋণে জর্জরিত।’
মজিবর বীজ ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. মজিবর রহমান (মজু) বলেন, ‘আমি অভিযোগটি পেয়েছি এবং বিষয়টি ব্র্যাক অফিসে জানিয়েছি।’
ব্রাক জয়পুরহাটের সিনিয়র টেরিটোরি অফিসার আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘ব্র্যাকের রাজা ধান-১৮-এর ব্যাপারে আমরা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘রাজা ধান লাগিয়ে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মৌখিকভাবে অভিযোগে পেয়েছি। প্রথমিকভাবে তদন্ত করে এই ধানের জন্য কৃষকেরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তার সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রয়োজনে গবেষণাগার থেকে তদন্ত টিম নিয়ে এসে পরীক্ষা করে দেখব। যদি রাজা ধানের বীজের সমস্যা হয়, তাহলে আমরা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবিদা খানম বৈশাখী বলেন, ‘ছবিসহ একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ব্র্যাক ধান-১৮ উপজেলার কৃষকেরা লাগিয়েছেন। তাদের বলা হয়েছিল এটি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। কিন্তু কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, তাদের ধানের গাছ মরে যাচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিসারের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত কমিটি গঠন করব এবং তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর অভিযোগের সতত্যা পাওয়া গেলে বিধি মতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’























