আক্কেলপুরের ভদ্রকালীতে দেখা মিললো নীল কপালি গির্দি পাখি

চৈতন্য চ্যাটার্জী

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:১৯ পিএম


আক্কেলপুরের ভদ্রকালীতে দেখা মিললো নীল কপালি গির্দি পাখি

ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।

 

য়পুরহাটের আক্কেলপুরে নীল কপালি গির্দি নামের একটি বিরল প্রজাতীর পাখির দেখা মিলেছে। পাখিটির মাথা, কপাল,গলা গাঢ় নীল। গলার নিচ থেকে বুক-পেট পর্যন্ত কমলা রঙের। ডানার পালক এবং লেজ কালচে। পাখিটির এদেশে নীল-লালগির্দি (Blue-fronted Redstart) বা নীল কপালি গির্দি নামে পরিচিত। এর কোন স্থানীয় বা আঞ্চলিক নাম নেই। উপজেলার সোনামূখী ভদ্রকালী গ্রামের একটি পুকুর পাড়ে এটির প্রথম দেখা পায় আক্কেলপুরের ছেলে আহনাফ আল সাদমান নামের এক তরুন আলোকচিত্রি।

 

পাখিটির তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, নীল কপালি গির্দি নামের ছোট আকারের পাখিটি সর্বশেষ ২০১৬ সালে মৌলভীবাজারের একটি এলাকায় দেখা যায়। তারপর থেকে এটিকে আর দেখা যায়নি। আক্কেলপুরের পৌর শহরের বাসিন্দা উদীয়মান আলোকচিত্রি শখের বসে ভদ্রকালী গ্রামের একটি পুকুর পাড়ে প্রকৃতির ছবি তুলতে গিয়ে সর্বশেষ গত শনিবার এই পাখির দেখা পায়। পরে এই খবরে ঢাকা, বগুড়া, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পেশাদার আলোকচিত্রিরা ওই এলাকায় এসে নীল কপালি গির্দি পাখির ছবি তুলে নিয়ে যায়।

 

 

এই পাখিটি এদেশে বিরল। সহজে এর দেখা পাওয়া যায়না। এটি এদেশে অনিয়মিত (Vagrant) পরিযায়ী পাখি হিসেবে বিবেচিত। এরা Muscicapidae পরিবারভুক্ত এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Phoenicurus frontalis.। নীল-কপালি লালগির্দি চড়ুই আকারের পাখি। লম্বায় ১৫ সেমি ও ওজনে ১৭ গ্রাম। পাখিটির কপাল গাঢ় নীল। দেহের নিচের অংশ কমলা ও বাদামি রংয়ের। কোমড় ও পেট কমলা ও লাল। লেজের কিনারা কালচে। চোখের চারদিকে রয়েছে সাদা বলয়। ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো।

 

পরিযায়ী এ পাখিটি শীত মৌসুমে বিভিন্ন ঝোপঝাড়, মাঠঘাট, পুকুর পাড় ও খোলা বনাঞ্চল এলাকায় বিচরণ করে থাকে।  তারা মুলত পোকামাকড় রসালো ফল ও বীজ খেয়ে জীবন ধারণ করে। এই পাখিগুলো একাকি বিচরণ করলেও প্রজননের পর ও পরিযায়নের সময় ছোট দলে বিভক্ত হতে দেখা যায়। সাধারণত মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। জমির আইল, দুই পাথরের ফাঁক বা গাছের খোঁড়লে মস বা শেওলা দিয়ে ছোট্ট বাটি আকারের বাসা বানায়। বাসা বানাতে গাছের ছোট্ট শিকড়, চুল, পালক ইত্যাদি ব্যবহার করে। স্ত্রী গির্দি ৩ বা ৪টি হালকা গোলাপি-ধূসর বা হালকা হলদে রঙের ডিম পাড়ে যার উপর থাকে হালকা লালচে দাগ।

 

 

আলোকচিত্রি আহনাফ আল সাদমান বলেন, সখের বসে পাখির ছবি তোলার ইচ্ছা শুরু থেকেই আমার ছিল। সেদিন বিকেলে আমি আর আনিস শেখ ভাই পাখির ছবি তোলার জন্য ঘুরতে বের হয়ে ওই গ্রামের হাড়িপুকুর নামের পুকুর পাড়ে একটা জঙ্গলে এর দেখা পাই। প্রথমে কালা গির্দি ভেবে ছবি তুলেছিলাম। পরে বাসায় এসে মাথার নীল অংশ দেখে সন্দেহ জেগেছিল। পরে গুগলে এ সার্চ দিয়ে দেখি এটা অতি দুর্লভ নীল কপালি গির্দি। এই পাখিটি বাংলাদেশেও গত আট বছরেও চোখে পড়েনি।

 

তিনি আরও বলেন, আমি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি Freelance Photographer Friends ফেসবুক গ্রুপ কর্তৃক ভারত বাংলাদেশ প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে অনলাইন প্রদর্শনী প্রতিযোগীতায় ১৭৩ জনের ৭০০টি ছবির মধ্যে ৩য় হয়েছি। এছাড়াও গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি ক্লাব হতে বর্ষ সেরা তরুন আলোকচিত্রি পুরষ্কারও পেয়েছি।

 

 

খবর পেয়ে পাখিটির ছবি তুলতে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ আদনান আজাদ আলোকচিত্রি কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, আমি দির্ঘদিন থেকে বন্যপাণী , পাখি, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র নিয়ে কাজ করি। দুর্লভ এই পাখিটি সহজে চোখে পড়ে না। এটির ছবি তোলার জন্য আমি এই এলাকায় এসেছি। ছবি তুলতে পেরে নিজেকে খুব আনন্দিত এবং সার্থক মনে হচ্ছে।

 

গাইবান্ধা সরকারি মহিলা কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক আরিফুর রহমান বলেন, আমি শখের বসে ছবি তুলি। দুর্লভ এই পাখিটি খবর পেয়ে আক্কেলপুরে পাখিটির ছবি তুলতে এসেছি।

 

 

উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল ইসলাম বলেন, শীতকালে ঠান্ডাপ্রবণ দেশগুলো থেকে এই ধরনের পাখি এদেশে এসে থাকে। এদের সচরাচর দেখা যায়না। এই পাখি অতিথি পাখি বলেই মনে হচ্ছে। তাদের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরীসহ তাদের নিরাপদ বিচরণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান এই বিরল প্রজাতীর নীল কপালি গির্দি পাখিটি ২০১০ সালে ঢাকায় দেখেছিলেন। তিনি বণ্যপ্রাণি প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষগা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, এটি পুরনো বিশ্বের চতক পাখি। এদের আবাসস্থল ভারতের দার্জিলিং, মধ্যচীন, হিমালয়ের পাদদেশের এলাকা, নেপাল এবং ভূটান। ২০১৮ সালের ভূটানে গিয়ে এই পাখির ছবি তুলেছি। মূলত ঠান্ডা প্রবণ এলাকার পাখি এগুলো। দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এই প্রথমবার এটিকে দেখা গেল। এরা কিছুটা ভবঘুরে জীবনযাপন করে থাকে। খবর পেয়ে এর ছবি তুলতে আমি আক্কেলপুরে এসেছি।

 

 

Ads