পার্বত্য চট্টগ্রামে মাতৃভাষায় শিক্ষা: বই আছে, ক্লাস নেই
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আলমারি খুললেই চোখে পড়ে রঙিন বইয়ের স্তূপ- চাকমা, মারমা, ককবরক ভাষায় ছাপানো সরকারি পাঠ্যপুস্তক। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে সেগুলোর ব্যবহার নেই; শিক্ষক জানেন না কীভাবে পড়াবেন, শিক্ষার্থীরাও পড়ছে না। ২০১৭ সালে সরকার পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক চালু করলেও বাস্তবায়নের ঘাটতিতে উদ্যোগটি এখন অনেকাংশে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র'র এ প্রতিবেদক কথা বলেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত ভাষা গবেষক ও জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ঞ্যোহ্লা মং এবং খাগড়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাবলি ত্রিপুরা–এর সঙ্গে। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে হতাশা, ক্ষোভ এবং সম্ভাবনার রূপরেখা।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, শুরু থেকেই স্কুলের রুটিনে মাতৃভাষার ক্লাস অন্তর্ভুক্তির দাবি থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে তা কার্যকর হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই)–এর নিয়মিত কারিকুলামে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান অন্তর্ভুক্ত না থাকায় শিক্ষকরা পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ পাননি। “কিছু প্রকল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ হয়েছে, কিন্তু তা প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই নয়,” বলেন তিনি।
মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় সমস্যা। ক্লাস আদৌ হচ্ছে কি না, হলে কীভাবে হচ্ছে—তার কার্যকর তদারকি নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মূল্যায়নে মাতৃভাষা বিষয়টি যুক্ত হয়েছে কি না—এ বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত না থাকলে শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি অগ্রাধিকার পায় না।

ঞ্যোহ্লা মং জানান, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই বিতরণ হলেও অধিকাংশ স্কুলে সেগুলো পড়ানো হয় না। “কারণ একটাই—প্রশিক্ষণ নেই। পিটিআই সিলেবাসে মাতৃভাষা শিক্ষাদানের মডিউল জরুরি ভিত্তিতে যুক্ত করতে হবে,” বলেন তিনি। শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মাতৃভাষা দক্ষতার মূল্যায়ন যুক্ত হলে যুবসমাজ ভাষাচর্চায় আগ্রহী হবে বলেও মত তাঁর।
তিন পার্বত্য জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড পরিচালিত প্রায় ৪ হাজার ৮০০ পাড়াকেন্দ্রকে মাতৃভাষা শিক্ষার সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেন তিনি। জনগোষ্ঠীভিত্তিক হওয়ায় পাড়াকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলে প্রাথমিক স্তরে পাঠদান সহজ হবে।
সহকারি শিক্ষক বাবলী ত্রিপুরা বলেন, “নিজের মাতৃভাষায় পড়াতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। শিশুরা দ্রুত বুঝতে পারে।” তবে প্রশিক্ষণের অভাব ও কাঠামোগত সহায়তার ঘাটতি কাটাতে না পারলে শিক্ষক-উদ্যোগও টেকসই হবে না।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ভাষ্য, মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের অধিকাংশ আদিবাসী ভাষাই কমবেশি বিপন্ন; পার্বত্য চট্টগ্রামের তুলনামূলক উন্নত ভাষা চাকমাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষত রেংমিটচা ভাষা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। ভাষা টিকিয়ে রাখতে অফিস-আদালত, পরিবার, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরে ব্যবহার বাড়াতে হবে।
তিনি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের ওপর জোর দেন—অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল কন্টেন্ট, এআই-ভিত্তিক টুলস এবং পূর্ণাঙ্গ অভিধান প্রণয়ন। “এখনও কোনো আদিবাসী ভাষায় পূর্ণাঙ্গ অভিধান নেই,” বলেন তিনি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, ILO Convention 169, United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০—সবখানেই আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার স্বীকৃত। জাতীয় শিক্ষানীতির অধ্যায় ২৩-এ মাতৃভাষাভাষী শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও বিশেষ উপকরণ সরবরাহের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার বই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে; কোথাও বই নিয়ে পরে ফেরত পাঠানো হয়েছে শিক্ষক সংকটে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় গুরুত্ব কমছে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়ার হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও অধিকারকর্মীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১। আদিবাসী অধ্যুষিত প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত একজন মাতৃভাষাভাষী শিক্ষক বাধ্যতামূলক নিয়োগ;
২। পিটিআই কারিকুলামে মাতৃভাষা শিক্ষাদান মডিউল সংযোজন;
৩। মাতৃভাষা বিষয় পরীক্ষায় বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি;
৪। তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ; বর্তমান ছয় ভাষার বাইরে আরও ৩৫–৪০টি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন;
৫। ডিজিটাল কন্টেন্ট, অভিধান ও পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিতকরণ;
৬। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের লাখো শিশু আজও নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সরকার বই ছেপেছে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না করায় উদ্যোগটি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রদর্শনীমূলক কর্মসূচি নয়—সমন্বিত, সময়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনাই পারে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষাকে টেকসই করতে। অন্যথায়, আগামী প্রজন্মের হাত ধরেই বিলুপ্তির দিকে চলে যেতে পারে বহু ভাষা—যা হবে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি।































