জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক, ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হল প্রথম সংসদ অধিবেশন

মোঃ আশরাফুল আলম

০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৮ এএম


জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক, ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হল প্রথম সংসদ অধিবেশন

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠকে বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও বাদানুবাদ হয়েছে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই আলোচনা কোনো সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য বা রোডম্যাপ ছাড়াই শেষ হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং এক পর্যায়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মতো ঘটনাও ঘটে।

রবিবার (৫ এপ্রিল) বিকেলে অধিবেশন শুরু হলে নোয়াখালী-২ আসনের সরকারি দলীয় সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫: ভবিষ্যতের পথরেখা -একটি রাজনৈতিক সমঝতার দলিল’ শীর্ষক একটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং এর বাস্তবায়নে গণভোটের রায়ের বাধ্যবাধকতা তুলে ধরেন।

সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের দাবি, জুলাই সনদ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল এবং এর বাস্তবায়ন অবশ্যই বিদ্যমান সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে হতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবিধানই হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র ভিত্তি এবং এটি এড়িয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সংবিধান হয় সংশোধন, স্থগিত বা বাতিল হয়—কিন্তু কোনো সনদ দিয়ে একে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা যায় না।

বিরোধী দল (জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট): বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, সরকার গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছে। এনসিপি সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং আখতার হোসেন প্রশ্ন তোলেন যে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে রায় দিয়েছে, তাকে অসাংবিধানিক বলা জনগণের মতামতের অবমাননা। তাদের মতে, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণভোটের ফলাফলই হওয়া উচিত সংস্কারের মূল ভিত্তি।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইনিভাবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে”। তিনি একে ‘সংবিধানের ওপর জালিয়াতি’ (fraud on the constitution) হিসেবে অভিহিত করেন। পাল্টা জবাবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেন, বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা যে প্রক্রিয়ায় শপথ নিয়েছেন এবং সংসদ গঠিত হয়েছে, তার অনেক কিছুই বিশেষ পরিস্থিতিতে করা হয়েছে, যা সবসময় আক্ষরিক সংবিধান মেনে হয়নি।

আলোচনার শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ‘বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেন, যা জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক সংশোধনী বিল তৈরি করবে। তবে এই কমিটিতে প্রতিনিধিত্বের সমতা নিয়ে বিরোধী দল সংশয় প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই স্পিকার সংসদ অধিবেশন সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।

সংসদের এই মতপার্থক্য রাজপথেও ছড়িয়ে পড়েছে। সংসদের ভেতরে ঐকমত্য না হওয়ায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী পক্ষের এই দূরত্ব দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পুনরায় অস্থির করে তুলতে পারে।

 

Ads