করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের, বাতিলের পথে ৫% করের ধাপ
০৩ জুন ২০২৬, ১০:১৬ এএম
ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এই করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করা হবে। তবে এর পাশাপাশি আগামী অর্থবছর থেকেই সর্বনিম্ন করের হার ৫ শতাংশ তুলে দিয়ে ১০ শতাংশ করার পরিকল্পনা চলছে, যার ফলে মধ্যবিত্তের করের বোঝা কিছুটা বাড়তে পারে।
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরগুলোতে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ঠিক এইভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর: ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা (চলতি সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে এটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে)। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা। ২০৩০-৩১ অর্থবছর: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে কর হারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমান নিয়মে করমুক্ত সীমার পরবর্তী ১ম ১ লাখ টাকার ওপর ৫% হারে কর দিতে হয়। নতুন পরিকল্পনায় এই ৫% করের ধাপটি সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হতে পারে।
নতুন সম্ভাব্য কর ধাপসমূহ: করমুক্ত সীমা পরবর্তী ১ম ৩ লাখ টাকা: ১০%, পরবর্তী ৪ লাখ টাকা: ১৫%, পরবর্তী ৫ লাখ টাকা: ২০%, পরবর্তী ২০ লাখ টাকা: ২৫%, অবশিষ্ট আয়ের ওপর: ৩০%।
প্রভাব: বর্তমানে একজন করদাতার বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা হলে তাকে ৫,০০০ টাকা কর দিতে হয়। কিন্তু নতুন নিয়মে (৫% ধাপ উঠে গেলে) ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার পরবর্তী ৭৫,০০০ টাকার ওপর ১০% হারে ৭,৫০০ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ, করমুক্ত সীমা বাড়লেও নিম্ন-মধ্যবিত্তের করের পরিমাণ ২,৫০০ টাকা বেড়ে যাবে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা হতে পারে। এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। মূলত স্বল্প আয়ের করদাতাদের সেই চাপ থেকে সুরক্ষা দিতেই এই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএন (TIN) ধারী রয়েছেন, যার মধ্যে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪৬ লাখ করদাতা রিটার্ন দাখিল করেছেন।
আগামী অর্থবছরেও বেশ কিছু খাতে করমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের:
জুলাইযোদ্ধা করদাতা: জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা বহাল থাকবে।
কৃষি খাত: স্বাভাবিক করদাতাদের ‘কৃষি থেকে আয়’ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত থাকবে।
চিকিৎসা ব্যয়: চাকরিজীবীদের কিডনি, লিভার, ক্যানসার, হার্টের চিকিৎসা, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার ও কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত চিকিৎসা সহায়তার অর্থ সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে।
বিনিয়োগ ও পেনশন: সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে প্রাপ্ত আয় এবং জিরো কুপন ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেট থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন- ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে করমুক্ত আয়সীমা এখনই বাড়ানো বেশি জরুরি। মূল্যস্ফীতি কমে এলে ভবিষ্যতে এটি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
অন্যদিকে, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রশংসা করলেও এর সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন:
"আগে থেকে করের হার জানা থাকলে ব্যবসা বা ব্যক্তিগত পরিকল্পনা সহজ হয়, যা বৈশ্বিক প্রথা। তবে এটি সর্বোচ্চ ২-৩ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সাথে করের হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা প্রয়োজন।"



















