আওয়ামী লীগের ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প আর থাকছে না: পিডিবি

মুহাম্মদ ইসমাইল হাসান

২৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম


আওয়ামী লীগের ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প আর থাকছে না: পিডিবি

 

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ আইনে অনুমোদন পাওয়া ৩ হাজার ৫৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু ও বর্জ্য) বিদ্যুৎ প্রকল্প নতুন করে চালুর আর কোনো সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল হওয়া এসব প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বর্তমান বিএনপি সরকারের গঠিত একটি কমিটি পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলো নতুন করে জীবিত করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

আইনি জটিলতায় আটকে গেছে প্রকল্পগুলো
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানিয়েছেন, ৩১টি প্রকল্প মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিশেষ আইনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমানে সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর। ফলে নতুন করে কোন আইনের অধীনে এই ৩১টি প্রকল্পকে পুনরুমোদন দেওয়া হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পিডিবির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমিটি এই আইনি জটিলতার বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে এবং এর কোনো বৈধ পথ না পেয়ে শিগগিরই সরকারের কাছে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত নেতিবাচক রিপোর্ট জমা দিতে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ পূর্বের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ওই ৩১টি প্রকল্পের মধ্য থেকে অন্তত কয়েকটিকে পুনরায় অনুমোদনের ব্যাপারে নীতিগতভাবে ইতিবাচক অবস্থানে ছিলেন। আর সেই উদ্দেশ্যেই তড়িঘড়ি করে পিডিবির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটিই যথাযথ এবং নিয়মতান্ত্রিক ছিল না, যা নিয়ে শুরু থেকেই বিদ্যুৎ বিভাগে ব্যাপক বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রচলিত আইনের কঠোর অবস্থানের কারণে স্থগিত থাকা এই প্রকল্পগুলো পুনরুজ্জীবিত করার সব পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ প্রদান ও দরপত্রের প্রক্রিয়া
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাতিল হওয়া ৩১টি প্রকল্পের মধ্যে ৬টি স্থানে ইতিমধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং পিডিবি তাদের সাথে চুক্তিও সম্পন্ন করেছে। এছাড়া আরও ৩ থেকে ৪টি স্থানে দরপত্রের মাধ্যমে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে, মূল বিনিয়োগকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছে, তারা আইনগতভাবেই এই অনুমোদন পেয়েছিলেন এবং প্রকল্পগুলো চালু থাকলে এই খাতে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হতো। বর্তমানে প্রকল্প বাতিলের আদেশ অবৈধ ঘোষণার দাবিতে কোম্পানিগুলো হাইকোর্টে রিট করেছে, যা বিচারাধীন রয়েছে।

দরপত্রের মাধ্যমে সরকারের বিশাল ব্যয় সংকোচন
বিশেষ আইনের চেয়ে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়ায় সরকারের বিদ্যুৎ কেনা বাবদ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পিডিবি ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগে পাবনার ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটির প্রতি ইউনিটের দাম ১০.১৫ মার্কিন সেন্ট ধরা হলেও, নতুন দরপত্রে প্যারামাউন্ড টেক্সটাইল তা মাত্র ৭.৯ সেন্টে করার চুক্তি করেছে। নীলফামারীতে এজে পাওয়ারের ৯.৯৮ সেন্টের ৫০ মেগাওয়াট প্রকল্পের কাজ এখন কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম করছে ৮.২৬ সেন্টে।

কক্সবাজারে ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আওয়ামী লীগ আমলের ৯.৯৮ সেন্টের বিপরীতে কনফিডেন্স পাওয়ার ৮.০৯ সেন্টে কাজ করছে। একই এলাকায় অন্য একটি ১০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পে বিশেষ আইনের ৯.৮৯ সেন্টের জায়গায় উন্মুক্ত দরপত্রে বিএম স্টার ট্রেডিং মাত্র ৬.৫৩ সেন্টে কাজ পেয়েছে। এছাড়া নোয়াখালীতে ইনফ্রাকো এশিয়ার ৯.৯৭ সেন্টের প্রকল্প এখন মাহিন-ভিদুলংকা ৭.৪৯ সেন্টে এবং বাগেরহাটে এশিয়া এনটেকের ১০০ মেগাওয়াটের ১০.০০ সেন্টের প্রকল্প কনফিডেন্স পাওয়ার ৮.০৯ সেন্টে বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি লামা (৭০ মেগাওয়াট), চকরিয়া (৩০ মেগাওয়াট) ও কক্সবাজার সদরের (৫০ মেগাওয়াট) প্রকল্পগুলোতেও এখন দরপত্রের মাধ্যমে নতুন করে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

উচ্চ মূল্যের আরও কিছু বাতিল প্রকল্প
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে আরও কিছু উচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প ছিল। যেমন— পিডিবি-আরপিসিএল এবং সিআরইসি ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে ১১.০৫ সেন্টে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং ত্রিশালে ৪৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ১০ সেন্টে অনুমোদিত হয়েছিল। এছাড়া কক্সবাজারে ১২.২৫ সেন্টে ও সাতক্ষীরায় ১২.২৪ সেন্টে ১০০ মেগাওয়াটের বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কসবাসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য থেকে ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প অনুমোদন পায়, যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছিল রেকর্ড ১৯.১ সেন্ট।

বিএনপি সরকারের নতুন কৌশলপত্র
এদিকে বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে আগের পরিকল্পনা, নীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির সমন্বয় ঘটিয়ে চলতি সপ্তাহেই একটি নতুন 'কৌশলপত্র' প্রকাশ করা হতে পারে। এই কৌশলপত্রে বেসরকারি খাতকে সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা থাকবে বলে জানা গেছে।

Ads