ঢাকা-বেইজিং দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর চাইল শি জিনপিং
২৭ জুন ২০২৬, ১২:০০ পিএম
বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
বৈঠক শেষে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
মুখপাত্র জানান, ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনার সূত্র ধরেই বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব আসে। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় লেনদেন বৃদ্ধি এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চীন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে কাজ করার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই বন্দরকে আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে কীভাবে একটি আঞ্চলিক হাবে (Regional Hub) রূপান্তর করা যায়—যা শুধু বাংলাদেশের নয়, অন্যান্য দেশেরও উপকারে আসবে—তা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি মোংলা বন্দরকে আরও আধুনিক, প্রগতিশীল ও সেবা-ভিত্তিক করতে আপগ্রেড করার বিষয়েও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে।
চীন সফরের শেষ দিনে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘পিপল টু পিপল’ বা জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ আরও জোরদার করতে চায় উভয় দেশ। সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, সামগ্রিক জ্ঞান বিনিময় (Knowledge Transfer) এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষা খাতের সহযোগিতা নিয়ে মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন (চীনা ভাষা) এবং সেই সাথে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই দুটি ক্ষেত্রেই চীন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার আলোকে বাংলাদেশকে সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে চীনা ভাষা শিক্ষার জন্য তারা শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করবে।
বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণে চীন সরকার হাত বাড়িয়ে দেবে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা খাতে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, রোবোটিক সার্জারি প্রবর্তন এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন অংশীদারিত্বের আগ্রহ দেখিয়েছে।
তিনি আরও জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বিদেশে যান। বাংলাদেশিদের এই চিকিৎসার সুবিধার্থে চীন তাদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করে উন্নত চিকিৎসা দ্বারের উন্মোচন করতে ইচ্ছুক।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সংকট রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছে। মাহদী আমিন বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। এই সংকট নিরসনে কোনো সংলাপ বা মধ্যস্থতার প্রয়োজন হলে চীন বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
বৈঠকের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি সমঝোতা বা ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত ভিত্তিতে সংলাপ শুরু হবে, যা নিয়ে এখন বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জোট ব্রিকস-এ (BRICS) বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহকে চীন আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
মুখপাত্র জানান, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় আশ্বাস দেন তিনি।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি উপস্থিত ছিলেন।



















