প্রথা ভেঙে নতুন দিগন্তের সূচনা : রাষ্ট্র সংস্কারে অনন্য তারেক রহমান
০৭ জুলাই ২০২৬, ১১:০১ পিএম
গত রোববার এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলো দেশ। গুলশানের বাসভবন থেকে সচিবালয়ে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেখতে পান, একটি মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির ব্যানার-ফেস্টুনে তার ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। নিজ দপ্তরে ফিরেই তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে ডেকে কড়া নির্দেশ দেন যে, সরকারি কোনো অনুষ্ঠানের প্রচারণায় বিলবোর্ড, ব্যানার বা ফেস্টুনে থ্রিডি কিংবা অন্য কোনো আঙ্গিকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি আর ব্যবহার করা যাবে না। প্রচার উপকরণের নকশা এমন হতে হবে যাতে অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ব্যক্তিবন্দনা নয়, বরং বিষয়বস্তুই পাবে সর্বোচ্চ প্রাধান্য। এই একটি মাত্র যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি বিগত ফ্যাসিবাদের কুৎসিত প্রথার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।
এর আগেও তিনি নীরবে-নিভৃতে আরও তিনটি বড় পরিবর্তন এনেছেন, যা সচরাচর আলোচনায় আসেনি। এখন থেকে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্তাদের কক্ষে আর কোনো ছবি ঝুলিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। বিগত ১৭ বছর ধরে চলা যে অবর্ণনীয় ব্যক্তিবন্দনা ও ছবি রাজনীতিকে মানুষ নিয়তি বলে ধরে নিয়েছিল, সেখানে তিনি এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। ছবি নিয়ে মাতামাতি বন্ধ করে সবাইকে দেশ গড়ার কাজে মন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের জন্য বিশেষ চেয়ারের প্রথার মূলোৎপাটন করেছেন এবং নামের আগে দীর্ঘ বিশেষণ বা উপাধির তৈলমর্দন বন্ধ করে কেবল ‘জনাব’ সম্বোধনের নিয়ম চালু করেছেন। পোশাক, চলাফেরা ও ভাষণে তার এই অনাড়ম্বরতা ও বিনয় তাকে অন্যদের চেয়ে অনন্য করে তুলেছে।
বিখ্যাত নাট্যকার এস এম সোলায়মানের ‘ইঙ্গিত’ নাটকে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর নেতাদের ছবি টানানোর যে উন্মত্ত ও কুৎসিত প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে উঠেছিল, সেই ইঙ্গিতের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছিল বিগত দুঃশাসকেরা। তারা আইন ও অধ্যাদেশ জারি করে প্রতিটি সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ওয়াশরুমের দেওয়ালেও পিতা ও কন্যার ছবি লটকাতে বাধ্য করেছিল। এমনকি ১৯৭২ সালের পর শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ না বলায় একজনের জিহ্বা কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল এবং বাসাবাড়িতে ছবি ঝুলিয়ে রাখার অলিখিত বাধ্যবাধকতা ছিল। আওয়ামী শাসকরা দেশকে অতীতের সেই অন্ধকার ঘরে আটকে রাখলেও, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিকে সেই বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে এক ঝলমলে সকাল উপহার দিয়েছেন। জনগণের স্বপ্নের প্রধানমন্ত্রী এখন বাস্তবে ধরা দিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মপদ্ধতি ও জীবনযাত্রাও এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। তিনি সরকারি গাড়ি বর্জন করে নিজের গাড়ি ব্যবহার করছেন, যার জ্বালানি ও ড্রাইভারের বেতন দেন নিজের পকেট থেকে। বাসভবনের কর্মীদের বেতন-ভাতাও তিনি সরকারি তহবিল থেকে না নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে পরিশোধ করেন। রাস্তায় চলাচলের সময় রাস্তা বন্ধ করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলার সংস্কৃতি এবং ৩০-৪০টি গাড়ির বিশাল কনভয় বাতিল করে তিনি তা মাত্র ৫-৬টিতে নামিয়ে এনে সাধারণ মানুষের কাতারে চলে এসেছেন। ব্যক্তিবন্দনার স্তুতি এবং নিরাপত্তার নামে জনগণকে দূরে ঠেলার কৌশলও তিনি খারিজ করেছেন।
রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সংসদে ডিনারের নামে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার খরচ তিনি নাকচ করেছেন এবং দুপুরের খাবার ও নাশতার ৮০০-১০০০ টাকার বিলাসী বাজেট মাত্র ১৫০ টাকায় নামিয়ে এনেছেন। তিনি নিজের বেতনের ১০% প্রতিমাসে সরকারি কোষাগারে জমা দেন, যা অনুসরণ করে এখন অনেক মন্ত্রীও নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং বেতনের ১০% জমা দিচ্ছেন। টুথপেস্ট থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রসাধনসামগ্রী ও ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি শতভাগ বাংলাদেশি পণ্যের ওপর নির্ভর করেন, যা তিনি বিদেশে নির্বাসনে থাকার সময়েও করতেন। এমনকি লিফটসহ দেশে উৎপাদিত সব পণ্য ব্যবহারে তিনি জোর দিচ্ছেন। দৈনিক সকাল সাড়ে ৭ থেকে ৮টার মধ্যে নাশতা শেষ করে পৌনে ৯টার মধ্যে দপ্তরে পৌঁছান এবং রাত ১০টা-সাড়ে ১০টা পর্যন্ত নিরলস কাজ করে যান।
সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দলের প্রতি তার আচরণ অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌজন্যপূর্ণ; বিরোধী দলীয় নেতার এলাকার সমস্যা সমাধানে দুজন মন্ত্রী পাঠিয়ে তিনি সবাইকে আপ্লুত করেছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম বদলের সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে একে তিনি ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ ও অপ্রয়োজনীয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ১৫-২০ লাখ টাকার যে বিশাল গচ্ছা ও জটিলতা ছিল, তা দূর করতে তিনি ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘শ্রমিক ঋণ’ চালু করেছেন, যা প্রবাসে গিয়ে কর্মীরা ধীরে ধীরে পরিশোধ করবেন। একই সাথে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য চালু হয়েছে ‘শিক্ষা ঋণ’, যা তারা কর্মজীবনে প্রবেশ করে পরিশোধ করতে পারবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে ৮০-১০০ জনের বিশাল বহর কমিয়ে ৩০ জনের নিচে নামানো হয়েছে এবং আমলাদের লাখ লাখ টাকার টিএডিএ (TADA) নিয়মও খারিজ করা হয়েছে। খলিফা উমরের (রা.) উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি নিকটজনদের বলেন, দেশের একটা প্রাণীও কষ্ট পেলে তার দায় তার নিজের; বিশেষ করে অবোধ প্রাণী ও পাখিদের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ দেন তিনি।
নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং ধর্মীয় ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত ও পাদরিদের বেতন চালু করেছেন। চালু হয়েছে ‘ওয়ান ট্যাব ওয়ান টিচার’ কার্যক্রম। প্রায় ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মাফ করা হয়েছে। লাখ লাখ খুদে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘কমলকুঁড়ি স্পোর্টস’ এবং ‘খুদে বৈজ্ঞানিক প্রকল্প’ এর মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এবং মূল শিক্ষার পাশাপাশি একটি বাড়তি ভাষা শিক্ষার কার্যক্রমও যুক্ত হতে যাচ্ছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহের অংশ হিসেবে ‘নজরুলবর্ষ’ ঘোষণা আরেকটি বড় চমক। নজরুলকে ‘বাংলাদেশের মন’ আখ্যা দিয়ে তিনি কবির সাম্যের গান ও মানবতার বাণী ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা বিভেদ ও হানাহানির অবসান ঘটিয়ে ঐক্য ও সমঝোতার মাধ্যমে সুখী-সমৃদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা দেয়। তার মূল লক্ষ্য একটাই—‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই লক্ষ্যেই তিনি জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন।
এভাবেই প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়ে প্রিয় জন্মভূমিকে বদলে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা তার মহান পিতা-মাতার প্রদর্শিত পথেরই প্রতিফলন। তবে কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, আমলা এবং বিএনপির একশ্রেণির নেতাকর্মী তার এই পরিচ্ছন্ন ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। কবি আহসান হাবীবের কবিতার মতোই, সূর্যমুখীর আলোর ছায়াতলে বেড়ে ওঠা এই কীটপতঙ্গ ও অন্যায়ের পোকাদের সুপথে আনতে হবে, প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ইতিহাস আজ জাতিকে এক অগ্নিপরীক্ষায় দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সামান্যতম ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। এই দিনবদলের সংগ্রামে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পুরো জাতি এখন এক নতুন আশায় সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।



















