প্রশাসনে নতুন গতি আনতেই রাজনৈতিক ও অভিজ্ঞদের শীর্ষ পদে পদায়ন: সরকারের অবস্থান

আহমেদ হোসাইন

২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৪ এএম


প্রশাসনে নতুন গতি আনতেই রাজনৈতিক ও অভিজ্ঞদের শীর্ষ পদে পদায়ন: সরকারের অবস্থান

 

প্রশাসনকে আরও জনমুখী, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তুলতে সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে নতুন রক্ত সঞ্চালনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি বোয়েসেল, বিআইডব্লিউটিসি ও বিসিকসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশেষজ্ঞদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য—প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড পুনর্বহাল করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং জনগণের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়  জারি করা আদেশে জানা গেছে, সাম্প্রতিক এক আদেশে বিআইডব্লিউটিসি, বিসিক, বিএসইসি এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়সহ বিভিন্ন সংস্থায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভূত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের এসব পদে নিয়ে এসে স্থবির হয়ে থাকা সংস্থাগুলোতে কাজের গতি ফেরানোই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

নতুন আদেশে যেসব সংস্থায় নতুন নেতৃত্ব আনা হয়েছে, তার তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন: মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. সালাহউদ্দিন সরকারকে।
বোয়েসেল (BOESL): ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ রাশেদুল হক।
বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (BFIDC): চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (অন্য এক আদেশে সাবেক সচিব জাকির হোসেন কামালকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি যোগ দেননি)।
বিআইডব্লিউটিসি (BIWTC): চেয়ারম্যান পদে পদায়ন করা হয়েছে এ টি এম আবদুল বারী ড্যানীকে।
জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ: নির্বাহী সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন মো. কামরুজ্জামান।
বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (BSEC): চেয়ারম্যান করা হয়েছে আবদুল খালেককে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (BSFIC): চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. শামসুজ্জামানকে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট: ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কাজী রওনাকুল ইসলাম।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড: চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন মো. জাকির হোসেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (BSCIC): চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বেনজীর আহমেদ।
বাংলাদেশ জুট করপোরেশন: চেয়ারম্যান করা হয়েছে মো. মামুন হাসানকে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়: অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. সামসুল আলম।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এসব সংস্থায় সিদ্ধান্তহীনতা ও বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও গতিশীলতা বজায় রাখতেই সরকার কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যোগ্যদের দায়িত্ব দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। সরকারের নীতি বাস্তবায়নে রাজপথের অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতার সমন্বয় ঘটানোকে এখন সময়ের দাবি বলে মনে করা হচ্ছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী সরকারের এই নীতিগত অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "সরকার প্রশাসনকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রমিত কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে চায় এবং দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা উচ্ছেদ করতে বদ্ধপরিকর। যেকোনো ইতিবাচক রূপান্তরের প্রাথমিক ধাপে সবকিছু পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।" সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সার্বিক জনকল্যাণের স্বার্থে এই সিদ্ধান্তকে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "আমাদের এই প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা রয়েছে। প্রমাণসহ কেউ কোনো প্রকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলতে পারবে না।"

নিয়োগ ব্যবস্থার এই পরিবর্তনকে বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট প্রশাসনিক বিশ্লেষকরাও। সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার এ বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিজেদের ভেতরের আস্থার অভাব দূর করতে এটি সরকারের একটি অত্যন্ত সঠিক ও নিরাপদ কৌশল।" তিনি উল্লেখ করেন, আমলাদের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, দলীয় তকমা লাগানো এবং অনিয়মের নানা অভিজ্ঞতার পর সরকার যখন নিশ্চিত হয়েছে যে শতভাগ নিরপেক্ষতা পাওয়া কঠিন, তখন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ওপর আস্থা রাখাই সার্বিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য সবচেয়ে কার্যকারী সমাধান হয়ে উঠেছে।

সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, নীতি ও নেতৃত্বের এই যুগোপযোগী পরিবর্তনের ফলে এসব রাষ্ট্রীয় সংস্থা তাদের পুরানো স্থবিরতা কাটিয়ে উঠবে। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং রূপকল্প অনুযায়ী প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা অর্জিত হবে।

Ads