বাজেট উচ্চাভিলাষী, বাস্তবতা-বিবর্জিত ও ঋণগ্রস্ত: নাহিদ ইসলাম
১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী, বাস্তবতা-বিবর্জিত ও ঋণগ্রস্ত’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় তিনি এ কথা বলেন।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, সাধারণ মানুষের চোখের সামনে এই বাজেটকে অনেক চাকচিক্যময় ও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ভেতরের বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উপমার ছলে বাজেটের তীব্র সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই বাজেট অনেকটা চানাচুরের মতো, খেতে ভালো লাগবে, দেখতে সুন্দর, কিন্তু এটার কোনো পুষ্টিগুণ নেই।’ অর্থাৎ, এটি সাময়িকভাবে দৃষ্টি নন্দন মনে হলেও দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা কার্যকর সমাধান দিতে পারবে না।
অর্থমন্ত্রী তাঁর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতায় ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ’-এর যে বুলি আওড়েছেন, সেটির কঠোর সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর মুখের মিষ্টি কথা ও পরিকল্পনা শুনলে মনে হবে দেশে হয়তো অনেক বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে পা দিলে দেখা যাবে ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক খাতের মূল ও মৌলিক সংস্কার নিয়ে বাজেটে কোনো ধরনের কার্যকর আলাপই নেই৷
নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণগুলোকে এই বাজেটে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে সরকার আসলে কী ব্যবস্থা নেবে, দেশের সম্পদ লুটেরা গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কিংবা বিগত বছরগুলোতে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে—তা কোন প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত আনা হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা অর্থমন্ত্রীর পুরো বক্তব্যে কোথাও পাওয়া যায়নি।’ এমনকি বর্তমান বাস্তবতায় সরকার কীভাবে নিজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে পারে, সে বিষয়েও বাজেটে কোনো কার্যকর ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
এনসিপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, বাজেট বক্তৃতা বা এর লিখিত রূপটি শুনলে ও দেখলে অনেক সুন্দর মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আসলে দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কোনো মৌলিক পরিবর্তন করতে পারবে না৷ কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক সংস্কার কখনো রাজনৈতিক সংস্কার থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা কোনো বিষয় নয়। অথচ রাজনৈতিক সংস্কার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে এই বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) ও অর্জন পুরোপুরি শূন্যের কোঠায়।
দেশে নজিরবিহীনভাবে ব্যাংকিং খাতে দলীয়করণ ও চরম রাজনীতিকরণ চলছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক আমাদের সামনে এখন একটা বড় ও জ্বলন্ত উদাহরণ, যেটা নিয়ে ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদেও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। আপনারা সাংবাদিকরা এবং দেশের জনগণ তার সবই শুনেছেন ও দেখেছেন।’
এ সময় তিনি প্রধান বিরোধী শিবিরের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল যে তারা ক্ষমতায় এলে দেশের আর্থিক খাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগ দেবে না এবং কোনো সিদ্ধান্তেই রাজনৈতিক বিবেচনা বা পক্ষপাত করবে না৷ অথচ বর্তমান সরকারের শাসনামলে আমরা এর উল্টোটা দেখছি। দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকেই আমরা প্রথম বিতর্কিত, সমালোচিত ও দলীয় নিয়োগের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটতে দেখেছি, যা দেশের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রস্তাবিত এই বিশাল বাজেটের আড়ালে যাতে হরিলুট না হতে পারে, সে জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রস্তাবিত বিশাল অঙ্কের এই বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে দেশের বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর আমূল সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘যদি অনতিবিলম্বে দুদক ও বিচার বিভাগ সংস্কার করা না হয়, তবে এই বিশাল ও উচ্চাভিলাষী বাজেটের আড়ালে একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজদের জন্য ব্যাপক ও অবাধ দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এতে সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয় বাড়বে এবং দেশ আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে।’























