যিনি ২৪ ঘন্ট কথা বলেন
০৬ অক্টোবর ২০১৮, ০২:০২ এএম
নাজিমউদ্দিন শিকদার গাজীপুরের সবুজ শ্যমল নদী ঘেরা কাপাসিয়া উপজেলার ভাকোয়াদী গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহন করেন। তৎকালীন সময় মফস্বলে শিক্ষা গ্রহনের তেমন প্রভাব না থাকায় বৃহৎ অংশই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। অন্যদিকে মানুষের দারিদ্রতা মানুষকে বাধ্য করতো পরিবারের সদস্যদের সাথে উপার্জনের কাজে লেগতে। বৃহৎ অংশের ব্যক্তিদের মধ্যে নাজিমউদ্দিন শিকদার ছিল একজন। তবে একেবারেই যে শিক্ষা গ্রহন করতে পারেন নি তেমনটাও নয়। গভীর আগ্রহ নিয়ে স্থানীয় মাদ্রাসায় আরবি শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহন শুরু করলেও দারিদ্রতার যাতাকলে থেমে যায় সেই আগ্রহ। বাধ্য হয় বাবা হামিদ শিকদারে সাথে কাজে যোগ দিতে। ঐ সময় কাজ বলতে ছিল নির্দিষ্ট চাল বা পয়সার বিনিময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়িতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা।
যারা পড়া-লেখা করছে তাদের জ্ঞান ভাল এবং যারা পড়া-লেখা করেনি তাদের জ্ঞান ভাল নয় এমন ধারনা অনেকেই করে থাকে। এবং তাদের এই ধারনাকে কেন্ত্র করে ঐ ব্যক্তিকে সমাজে ঐ ভাবেই মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু পড়া-লেখা না করেও যে নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে প্রমান করা যায় বর্তমান সময়ে তার বাস্তব প্রমান নামিমউদ্দিন। ওনার জ্ঞান শক্তি এতোটাই শক্তিশালী যে উনার ভাকোয়াদী গ্রামের প্রতিটি ব্যক্তির নাম পরিচয় সম্পর্কে ওনি অবগত। শুধু বর্তমানে যারা সমাজে অবস্থান করছে তাদের নয়; ৮-১০ প্রজন্মের আগের মানুষের নামও ওনি তরতর করে বলতে পারে। অনেকেই ওনার কাছে আসে দাদার দাদা সম্পর্কে জানতে। জমি সংক্রান্ত কোন ব্যাপারে নাম নিয়ে কোন বিব্রান্তি থাকলে ওনার কাছে আসলে তার সমাধান খুব সহজেই মিলে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ৮৮ বছর বয়সে ২৪ ঘন্টা থেকে ঘুম ও খাওয়া ছাড়া বাকি সময় একা একা অনবরত কথা বলতে থাকেন। ওনার কথার বিষয় বস্তু থাকে এলাকার মানুষকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। কে বর্তমান সময়ে কি করছে, তার কাজের মধ্যে কোনটি ইতিবাচক আর কোনটি নেতিবাচক তা নিয়ে বরাবরই তিনি আলোচনা করেন। হয়তো মস্তিষ্কের মধ্যে বার বার একই বিষয় নিয়ে ঘুরপাক খাওয়ার কারণে তা খুব সহজেই মনে রাখতে পারে। কিন্তু ওনার আলোচনার সঙ্গি ওনি নিজেই। একা একা কথা বলার সময় যখন সামনে কোন মানুষ চলে আসে তখন তাকে সালাম দিয়ে ঠিকঠাক সম্বোধন করে কেমন আছে তা জানতে চাইবে। পরে শুরু করবে ঐ ব্যক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলা। কারণ ভাকোয়াদী গ্রামের এমন কোন মানুষ নেই যাকে ওনি চিনে না; তবে অন্য গ্রাম বা যারা বর্তমান সময়ে গ্রামের বাহিরে অবস্থান করছে তাদের দিক দিয়ে ভিন্ন কথা। ভাকোয়াদী বাজার থেকে সামান্য সামনে কাপাসিয়া-ভাকোয়াদী সড়কে প্রায় সময়ই নাজিমউদ্দিনকে বসে থাকতে দেখা যায়। রাস্তার পাশে বসে থাকার সময় কোন ব্যক্তিকে সালাম দেওয়ার সামান্য সুযোগ পেলে সে সুযোগ ওনি হাতছাড়া করেন না।
চাঁদপুর ইউনিয়নের ৩৩ গ্রামের ভিতরে আরো অনেক প্রবীন ব্যক্তি থাকলেও ওনি সবার থেকে ব্যতিক্রম। কোন কোন্দলে নেই। মানুষের সাথে কথা বলার শেষে বার বার ক্ষমা চাওয়াটা ওনার একটি স্বভাব। সড়কের পাশাপাশি বাড়ির পাশে চালা জমিতেও ওনাকে প্রায় সময় বসে থাকতে দেখা যায়। নামাজের সময় হলে কাধে রাখা লুঙ্গিটি সবুজ ঘাসের উপর বিছিয়ে নামাজ আদায় করে নেয়। তাছাড়া সাপ্তাহে এক দিন (প্রতি শুক্রবার) রোজা রাখেন। সাপ্তাহে এক দিন রোজা রাখেন প্রায় ২০ বছর ধরে। গ্রামের কোন অনুষ্ঠান ভাল দিন বলে সাধারণত শুক্রবারই করা হয় আর গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহেই ওনার দাওয়াত মিলে। কিন্তু রোজা বাদ দিয়ে অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে বরাবরই বিরত থাকেন নাজিমউদ্দিন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া নিজের আগ্রহকে সাড়া দিয়ে বিশেষ প্রয়াস প্রচেষ্টায় বাংলা পড়ার অন্যন্য প্রমান নাজিমউদ্দিন। ৮৮ বছর বয়সে বীনা চশমায় খুব সুন্দর করে বাংলা পড়তে পারেন। শুধু বাংলা নয় একটু সময় নিয়ে ইংরেজিও পড়তে পারেন। পাড়ার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা কৌতুহলবসত প্রায় সময়ই কোন বইয়ের পাতা বা পত্রিকা নিয়ে ওনার কাছে আসে পড়ে দিতে।
চাঁদপুর ইউনিয়নের ৩৩ গ্রামের একজন বটবৃক্ষ হিসেবেও অনেকে মনে করেন। আরে অনেক প্রবীন ব্যক্তি থাকলেও নাজিমউদ্দিন শিকদার আচরনগত দিক দিয়ে সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অনেকে হয়তো ওনার আচরন দেখে মনে করবে পাগল ধরনের ব্যক্তি। কিন্তু না; যারা একটু খেয়াল করে ভেবে দেখে তারা নিশ্চয়ই বুঝতে ওনি একজন আবেগপ্রবল মানুষ। ৩ মেয়ের মাঝে ২ ছেলে নামিজউদ্দিন শিকদারের। বড় ছেলে রেয়াজউদ্দিন (৪০) স্থানীয় বাজারের পাশে দোকান চালায়। গত ৮ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে যাওয়াতে তার এক মাত্র ভরসা হুইয় চেয়ার। বাড়ি থেকে হুইল চেয়ারে করে দোকানে যায় এবং দোকান থেকে বাড়িতে আসেন যার নিত্য সঙ্গি হয় ওনার স্ত্রী। আরেক ছেলে ফাইজউদ্দিন(৩০)। যিনি বর্তমানে একজন বেকার ব্যক্তি। দারিদ্রতার যাতাকল থেকে নিজের পরিবারকে উঠানে না পারলেও নাজিমউদ্দিনের মুখের কথায় মনে হবে ওনি প্রকৃত একজন মেহমানদার লোক। ঘরে কিছু থাকুক আর না থাকুক সকাল স্বন্ধ্যা দাওয়াত দিতে মোটেও ভুল করেন না।
জীবন সংগ্রামে সৎ পথে নিজেকে টিকিয়ে রেখে আজকের এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন নাজিমউদ্দিন। সাড়া দিন অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে তেমন কোন কষ্ট না হলেও প্রয়োজনীয় কোন কথা বলা সময় বুঝা যায় বয়সের ভড়ে কথা বলতে খুব কষ্ট হয়। মাঝে সাঝে কানেও কম শুনে। কথা বলার সময় কোন কোন মুহুর্তে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে অজানা কিছু দুঃখ মিশ্রিত পানি। তখন ভাঙ্গা গলায় ওনার পা ভাঙ্গা ছেলেটার কথা বলেন, আবার কোন কোন সময় নিজের কথাও বলেন। জীবনের পথে চলতে চলকে কখন যে প্রাণ নামের পাখিটা উড়ে যান সেই ভয়ে সকলের নিকট বার বার দোয়া চাইতে থাকে। পাঠাকদের কাছেও দোয়া চেয়েছে...............
লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া, গাজীপুর


































