হাওড়ার বাঁধ ভেঙে ৩০ গ্রাম প্লাবিত

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১৯ জুন ২০২২, ০৪:১২ পিএম


হাওড়ার বাঁধ ভেঙে ৩০ গ্রাম প্লাবিত

ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।


ভেঙে গেছে হাওড়ার বাঁধ। অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়ে আকস্মিক বন্যার রূপ নিয়েছে। ক'দিনের টানা ভারী বর্ষণ, ভারত থেকে নামা পাহাড়ি ঢলের পানির প্রবল তোড়ে শনিবার (১৮ জুন) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী কর্ণেলবাজার এলাকায় ভেঙে যায় হাওড়া নদীর বাঁধ। এতে সীমান্তবর্তী ও আশপাশ এলাকার ৩০ গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কয়েকশ' পরিবার পানিবন্দী। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলী জমি, গাছ-পালা, এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুরের মাছ। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দু'টি স্কুল।

 

স্থানীয় এলাকাবাসী ও প্রশাসন সূত্র জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকে টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলে আখাউড়া উপজেলার হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে এবং স্থলবন্দর এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা কালন্দি খাল দিয়ে ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানি হু হু করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছিলো।এরই মাঝে শনিবার ভোরে আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্ধ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কর্ণেলবাজার সংলগ্ন আইড়ল এলাকায় হাওড়া নদীর বাঁধ ভাঙার বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্থানীয় মনিয়ন্ধ ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চৌধুরী দীপক।তিনি জানান,পানির প্রবল তোড়ে বাঁধ সংলগ্ন একটি পীচ ঢালাই সড়কের প্রায় ৩০ ফুট অংশ ভেঙ্গে কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।পার্শ্ববর্তী মোগড়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামসহ মনিয়ন্ধ ইউনিয়নের ১১টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামগুলোতে থাকা অনেক পুকুরের মাছ পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ায় মৎস্য চাষীরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।


ক্ষতিগ্রস্থরা জানান, গত ২৪ ঘন্টায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে আখাউড়া উপজেলার কালন্দি খাল এবং হাওড়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সীমান্তবর্তী আখাউড়া দক্ষিণ, মোগড়া এবং মনিয়ন্ধ ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েন লোকজন। ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামগুলোর মধ্যে আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের বঙ্গেরচর, আবদুল্লাহপুর, বীরচন্দ্রপুর, সেনারবাদী, বাউতলা, কালিকাপুর, উমেদপুর, কুসুমবাড়ি,আওড়ারচর, ধাতুরপহেলা, মোগড়া ইউনিয়নের খলাপড়া, ছয়ঘরিয়া, নোয়াপাড়া, বচিয়ারা, সাহেবনগর, রহিমপুর, নিলাখাদ, টানুয়াপাড়া, দরুইন, চরনারায়ণপুর, আদমপুর এবং মনিয়ন্ধ ইউনিয়নের জয়নগর, আইড়ল, ইটনা, খারকুট,মিনারকুট, তুলাইশিমুল, বড় লৌহঘর, ছোট লৌহঘর, বড় গাঙ্গাইল, লক্ষ্মীপুর, ও বাণ্ডসার গ্রামে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। তাছাড়া ধরখার ইউনিয়নের ভাটামাথা, চন্দ্রপুর, ভবানীপুর, ধরখার, রুটি, পার্শ্ববর্তী কসবা উপজেলার বিনাউটিসহ আশপাশ গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।


এদিকে আখাউড়া-আগরতলা সড়কের স্থলবন্দর এলাকার কিছু অংশেও ওঠেছে পানি। তবে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। আখাউড়া স্থলবন্দর এলাকায় সিএণ্ডএফ এজেন্ট ও আমদানি-রপ্তানিকারক বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট কার্যালয় ও কাস্টমস হাউজ। এদিকে আব্দুল্লাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কর্ণেল বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে পারেনি। বন্ধ রয়েছে পাঠদান। বাড়িতে পানি ওঠায় ২৮ টি পরিবারকে আব্দুল্লাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় দিয়েছেন প্রশাসন।


ক্ষতিগ্রস্থ শাহানারা বেগম জানান, উজান থেকে নেমে আসা পানি তার বসতঘরে প্রবেশ করেছে। তিনি অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের সহায়তা তিনি পাননি। দ্রুত সময়ের মধ্যে তিনি সহায়তা প্রত্যাশা করছেন। মনিয়ন্ধ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম চৌধুরী দীপক বলেন, 'আমার ইউনিয়ন এলাকার ১১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সব এলাকায় এখন পর্যন্ত সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পৌঁছায়নি। তবে জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।' আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, 'আমার ইউনিয়ন এলাকার ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করছি।'


আখাউড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. লুৎফুর রহমান বলেন, 'অতি বৃষ্টির কারণে বিদ্যালয় মাঠে পানি ওঠায় পাঠদান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি সরে গেলে পরবর্তীতে শ্রেণী কার্যক্রম চালু হবে।' আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউেনও) অংগ্যজাই মারমা বলেন, 'আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রস্ততি নিয়েছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাৎক্ষণিক কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তারা দেখছেন। ২৮টি পরিবারকে একটি স্কুলে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে ৩০কেজি চাল ও নগদ এক হাজার ৫০০টাকা দেওয়া হবে।'


হাওড়া নদীর বাঁধ ভাঙ্গার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক মো. শাহগীর আলম গতকাল শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি পানিবন্দি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখেন। পরে জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের জানান, 'আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে নানা ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছে। বন্যা দুর্গতদের দুর্ভোগ লাঘবে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের খোঁজখবর নিতেও শুরু করেছেন। ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ নিরুপণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ ২৮টি পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে সহায়তা দেয়া হয়েছে। পানি কমে যাওয়ার পর বাঁধ মেরামত কাজ শুরু হবে।'

Ads