অর্থনৈতিক উন্নয়ন : প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়
০৪ মার্চ ২০২০, ০৫:০৪ পিএম
ছবি-সংগৃহীত
প্লাস্টিক বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার। প্লাস্টিকজাত পণ্য ব্যবহার বৃদ্ধির মূল কারণ হচ্ছে প্লাস্টিকজাত পণ্যের স্বল্পমূল্য ও সহজলভ্যতা। এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকের বেশিরভাগই একবার ব্যবহার উপযোগী। প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে প্রতিদিনই তৈরী হচ্ছে প্রচুর পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য। প্লাস্টিক পচনশীল না হওয়ায় তা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৫ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য যেমন পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ তেমনি এই প্লাস্টিক বর্জ্যরে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা গড়তে পারি একটি সুন্দর রাষ্ট্র, তৈরী হবে নতুন কর্মসংস্থান, হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ ও জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি। কিন্তু চাইলেই আমরা প্লাস্টিক উৎপাদন বন্ধ করতে পারব না, পারব যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে। আমাদের দেশে উৎপাদিত সব ধরণের (পচনশীল এবং অপচনশীল) বর্জ্য একসাথে ডাম্পিং করা হয় কোনো খোলা জায়গায়। ফলে টোকাইরা অল্প পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য ডাম্পিং এলাকা থেকে সংগ্রহ করতে পারলেও বেশিরভাগই রয়ে যাচ্ছে ময়লার স্তুপের নিচে। যদি উৎপাদনস্থল থেকেই সব ধরণের বর্জ্য আলাদা আলাদা চেম্বারে সংগ্রহ করা যায় তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে সহজ।
বাংলাদেশে জ্বালানি হিসাবে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এ সবই অনবায়নযোগ্য সম্পদ। ফলে এই জ্বালানি সম্পদ শেষ হয়ে যাবে। আমাদের অফুরন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে আমরা পেতে পারি জ্বালানি তেল। যা আমাদের জ্বালানির চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করতে পারবে। প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেল তৈরী করেছেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর অধ্যাপক সতীশ কুমার। এভাবে উৎপাদিত পেট্রোলের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় পেট্রোলের দামও কম হবে। তিনি বলেছেন,পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) এবং পলিথিলিন টেকেফট্যালেট (পেট) বাদে সব ধরণের প্লাস্টিক থেকে পেট্রোল তৈরী করা সম্ভব। ড.মইন উদ্দিন সরকার বলেন প্রতি টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য থেকে ১০ সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাস, ১ হাজার ৩০০ লিটার জ্বালানি তেল এবং ২৩ লিটার জেট ফুয়েল তৈরী করা সম্ভব।এতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম পরবে ২০ টাকা। সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে যথাযথ গুরুত্ব দিলে আমাদের জ্বালানির উপর চাপ কমবে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যরে বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে ময়লার স্তুপে, নদীতে, সমুদ্রে। ফলে ঘটছে ভয়ঙ্কর পরিবেশ দূষণ, বছরে ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬১৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে শুধুমাত্র প্লাস্টিকজাত বর্জ্যরে কারণে। প্লাস্টিক বর্জ্যরে রিসাইক্লিংই হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে লাভবান হওয়ার একমাত্র উপায়। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে রিসাইক্লিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন আসবাব, প্লাস্টিকের বাক্স, বালতি, চেয়ার ইত্যাদি তৈরী করতে পারি। বাংলাদেশে বর্তমানে অনেকগুলো প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা তৈরী হয়েছে, তবে তা প্লাস্টিক বর্জ্যরে তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। প্লাস্টিক বর্জ্যরে উৎস থেকে যথাযথ উপায়ে সংগ্রহ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে রিসাইক্লিং কারখানা গড়ে তুললে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ কমবে, প্লাস্টিকের বিষাক্ততা থেকে পরিবেশ ও জীব রক্ষা পাবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরী হবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
প্লাস্টিক বর্জ্যরে পূর্ণব্যবহার আমাদের কৃষিখাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে সেচের পাইপ, প্লাস্টিক ফিল্ম ইত্যাদি তৈরী করতে পারি। নতুন প্লাস্টিক পণ্যের চেয়ে বর্জ্য থেকে তৈরী পণ্যের উৎপাদন খরচ কম হয় ফলে পণ্যের দাম ও কম হবে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন মাথাপিছু ৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। ভবিষ্যতে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। এই প্লাস্টিক বর্জ্য বিশেষায়িত চুল্লিতে পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়ানোর ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না তবে কমবে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ। এভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এর দাম প্রতি কিলোওয়াট ঘন্টা ৮ দশমিক ৭৫ টাকা করে ফলে আমাদের অর্থনীতি উন্নত হবে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের লালমনিরহাটে রাশেদুল ইসলাম ও আসমা খাতুন দম্পতি পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরী করেছন বোতল বাড়ি। আসমা খাতুন বলেন, বোতল বাড়ি ইটের চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি শক্ত। বালু গরমে তাপ শোষণ করে ঘরকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা রাখে। গরমের দিনে অন্যান্য ঘরের তুলনায় এটা শীতল থাকে। পরিবেশবান্ধব, তাপশোষক, অগ্নিনিরোধক ও ভূমিকম্প সহনীয় এ বাড়িটি তৈরীতে ইটের বাড়ি অপেক্ষা ৪০ শতাংশ কম টাকা খরচ হবে। বাড়িটিকে বলা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব বা ইকোহাউস। রাশেদুল ইসলাম ও আসমা খাতুন দম্পতির মতো আরো মানুষ বোতল বাড়ি তৈরী করলে পরিবেশ রক্ষা পাবে বর্জ্য প্লাস্টিক বোতল থেকে এবং অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া যাবে।
মানিকগঞ্জে মুমানু পলিয়েষ্টার ইন্ডাষ্ট্রিজে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পানির বোতল দিয়ে তৈরী হচ্ছে ফাইবার। তা দিয়ে সুতা, তারপর রংবেরং এর পলিয়েষ্টার কাপড়। সেগুলো থেকে তুলাও উৎপাদন হয়। এগুলো রপ্তানি করে বছরে আয় হচ্ছে ২০০ কোটি টাকা। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ টন তুলা উৎপাদিত হয়। প্লাস্টিক বোতল সংগ্রহ করে সেগুলো ছোট ছোট ফ্লেক্স তৈরী করা হয়। তারপর সেগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরী হয় সুতা। এ প্রক্রিয়ায় যে বর্জ্য উৎপাদন হয় তা রিসাইকেল করে তৈরী করা হচ্ছে তুলা। ফলে পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে বিষাক্ত প্লাস্টিক থেকে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিও উন্নত হচ্ছে।
২০১৫ সালে ভারত ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তৈরী করেছে ১ লক্ষ কিলোমিটার রাস্তা। এই কৌশলটি আবিষ্কার করেন অধ্যাপক শ্রী রাজাগোপালন বাসুদেবন। তার মতে, প্রচলিত রাস্তাগুলোর তুলনায় প্লাস্টিক ব্যবহার করে বানানো রাস্তাগুলো অনেক মজবুত। বন্যা কিংবা চরম উত্তাপের মতো কঠিন পরিবেশেও অনেক বেশি টেকসই। বাংলাদেশে এভাবে বর্জ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করে রাস্তা তৈরী করলে রাস্তা তৈরীর পিচ বা পাথরের উপর চাপ কমবে, রাস্তা টেকসই হবে ফলে অর্থের অপচয় কম হবে।
প্লাস্টিক বর্জ্যরে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। প্লাস্টিক বর্জ্যকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ১৫০ টির বেশি কারখানা গড়ে ওঠেছে। এসব কারখানায় প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করে ছোট ছোট টুকরা বা পেট ফ্লেক্স তৈরী করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এসব পেট ফ্লেক্স জীবানুমুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত করে তৈরী হচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাবারের টিন বা প্যাকেট। এসব পেট ফ্লেক্স প্রতি কেজি ৭০-৭৫ টাকা করে বিক্রি করা হয়। বাংলাদেশে ৭৫টি পেট ফ্লেক্স রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশ পেট ফ্লেক্স ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের মতে, এসব পেট ফ্লেক্স থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বছরে ৫০০ কোটির বেশি। বর্তমানে চীনের সাথে সাথে ভারত ও ভিয়েতনামও এসব আমদানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। এসব প্লাস্টিক বর্জ্য বিদেশে রপ্তানির ফলে কমছে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ, তৈরী হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান এবং হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নও।
প্লাস্টিক হচ্ছে নীরব ঘাতক। প্লাস্টিক অব্যবস্থাপনা পরিবেশ ও মানবজাতির জন্য মারাতœক হুমকি। প্লাস্টিক বর্জ্যরে যথাযথ ব্যবস্থাপনা তথা পূর্ণব্যবহারই পারে প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে। প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা ও সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
শিক্ষার্থী
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল,ময়মনসিংহ।
samiasultana0708@gmail.com


















