শিল্প কারখানায় জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার

তাপসী হাবীবা

০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:২০ পিএম


শিল্প কারখানায় জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার


জৈবপ্রযুক্তি বা জীবপ্রযুক্তি (Biotechnology) হলো একটি প্রযুুক্তিগত ক্ষেত্র যা বৈজ্ঞানিক ও প্রকৈাশলগত নীতি অনুসরণ করে ও জীবিত অণুজীব, কোষ বা জীবের উপাদান ব্যবহার করে মানবজাতির বিভিন্ন চাহিদা পূরণের জন্য পণ্য বা প্রযুুক্তি উদ্ভাবন করে। জীবন্ত প্রাণী, কোষ এবং অন্যান্য জৈবিক সিস্টেম ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য এবং প্রযুক্তি তৈরি করার  এই বিজ্ঞান, বৈশ্বিক শিল্পের বিশদ রূপান্তর এনে দিয়েছে। পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, শক্তি (Energy), কৃষি  এবং স্বাস্থ্যসেবা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জৈব প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিল্প  কারখানা গুলো জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশ বান্ধব এবং সাশ্রয়ী বিভিন্ন টেকসই উৎপাদন  পদ্ধতি, পণ্যের গুণমান বৃদ্ধি, এবং উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

শিল্প কারখানায় জৈবপ্রযুক্তির এই ব্যবহার শিল্প জৈবপ্রযুক্তি এবং সাদা জৈবপ্রযুক্তি (White Biotechnology) নামেও পরিচিত। সাদা জৈবপ্রযুক্তির আধুনিক প্রয়োগ এর মাধ্যমে টেকসই  উৎপাদনে জৈবপ্রযুক্তি  নবায়নযোগ্য ((Renewable) শক্তি থেকে রাসায়নিক শক্তি উৎপাদন এর জন্য উপকরণ এবং জ্বালানী  উৎস, জীবন্ত কোষ এবং/অথবা তাদের এনজাইম ব্যবহার করে থাকে । জৈবপ্রযুক্তির এই ক্ষেত্রটি ব্যাপকভাবে শিল্পক্ষেত্রে তৃতীয় তরঙ্গ (Third Wave) হিসেবে বিবেচিত হয়, যা প্রথম দুটি তরঙ্গ (চিকিৎসা বা লাল জৈবপ্রযুক্তি এবং কৃষি বা সবুজ জৈবপ্রযুক্তি) থেকে আলাদা। যদিও এক্ষেত্রে চিকিৎসা এবং কৃষি ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ আলাদা দুটি ক্ষেত্র ধরা হয়েছে কিন্তু এই ক্ষেত্র দুটি শিল্পক্ষেত্রের মধ্যেও পরে থাকে। কারণ চিকিৎসা ক্ষেত্রের যুগান্তকারী কিছু ওষুধ এবং  কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন শস্যের জিনগত পরিবর্তনে জৈবপ্রযুক্তির বিশেষ অবদান রয়েছে। 

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জৈবপ্রযুক্তি
প্রতিনিয়ত মানবসভ্যতার বিভিন্ন আবিষ্কার মানব সভ্যতাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার সাথে পরিবেশের উপর তার ছাপ রেখে যাচ্ছে, যার একটি হলো বর্জ্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জৈবপ্রযুক্তি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে, বিশেষ করে শিল্পবর্জ্য মোকাবেলা যা পরিবেশের উপর বিভিন্ন ভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। প্রচলিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কৌশলগুলো পরিবেশের জন্য বিভিন্নভাবে ক্ষতিকর হতে পাওে, কিন্তু এক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তি এই প্রচলিত ব্যবস্থার একটি প্রযুক্তিগত বিকল্প। 

বায়োরিমেডিয়েশন (Bioremediation), এটি এমন একটি জৈবপ্রযুক্তি যা ক্ষতিকারক দূষককে ভাঙতে এই পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, এবং উদ্ভিদের মতো অণুজীবগুলোকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। Pseudomonas প্রজাতির মতো অণুজীবগুলো শিল্পবর্জ্যে পাওয়া হাইড্রোকার্বন, ভারী ধাতু এবং কীটনাশকের মতো বিষাক্ত যৌগগুলোকে হ্রাস করে। এই প্রক্রিয়াটি Oil Spillage পরিষ্কার, মাটি দূষণমুক্তকরণ এবং পানি পরিশোধনে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও  জৈবপ্রযুক্তি বায়োডিগ্রেডেবল পদার্থের বিকাশকেও সহায়তা করে। স্টার্চ, সেলুলোজ বা পলিল্যাকটিক অ্যাসিড (PLA) এর মতো নবীকরণযোগ্য বস্তু থেকে তৈরি বায়োপ্লাস্টিকগুলো প্রচলিত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। জীবাণু এর জৈবিক কার্যক্রমের ফলে এই বায়োপ্লাস্টিকগুলোর ক্ষতিকারক পদার্থ ভেঙে যায়, যা শিল্প বর্জ্যের পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে।

খাদ্য ও পানীয় শিল্পে জৈবপ্রযুক্তি 
খাদ্য ও পানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতিগুলো প্রাচীন কাল থেকে মানুষ ব্যবহার করে আসছে। বর্তমান এই আধুনিক যুগে প্রাচীন পদ্ধতিগুলোর সাথে জৈবপ্রযুক্তির সংমিশ্রণ খাদ্য ও পানীয় শিল্পে ব্যপক পরিবর্তন সাধন করেছে। বিশেষ করে গাঁজন প্রক্রিয়ার ব্যাবহার এই শিল্পক্ষেত্রকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। গাঁজন প্রক্রিয়া, শর্করাকে অ্যাসিড  বা গ্যাসে রূপান্তর করতে অণুজীব ব্যবহার করে, রুটি, বিয়ার, ওয়াইন, দই এবং পনির তৈরি করে। জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে, খাদ্যের গুণমান উন্নত করতে, শেলফ-লাইফ প্রসারিত করতে এবং নিরাপত্তা উন্নত করতে গাঁজন প্রক্রিয়াকে আরো দক্ষ এবং নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, Amylase এনজাইম স্টার্চকে শর্করাতে ভেঙে দেয়, যার ফলে এটি বেকিং এবং বিভিন্ন মিষ্টি জাতীয় খাবারের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আরেকটি এনজাইম Protease দুধ জমাট বাঁধায়, এবং এটি পনির ও দই তৈরি করতে ব্যাবহৃত হয়। তাছাড়া, জৈবপ্রযুক্তি কার্যকরী খাবার বিকাশে সহায়ক প্রোবায়োটিক, ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর মতো উপাদান তৈরি করে। 

ওষুধশিল্পে জৈবপ্রযুক্তি
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োম্যানুফ্যাকচারিংয়ের (Biomanufacturing) এর ক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতি অনেক, বিশেষ করে ওষুধ, ভ্যাকসিন এবং থেরাপির বিকাশ। ওষুধশিল্পে জৈবপ্রযুক্তির প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রয়োগগুলোর মধ্যে একটি ছিলো মানব ইনসুলিনের উৎপাদন। জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা Escherichia Coli ব্যাকটেরিয়াতে মানব ইনসুলিনের জিন ঢুকাতে সক্ষম হয় যেটি ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

একইভাবে, জৈবপ্রযুক্তি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিগুলোর বিকাশে সাহায্য করে; প্রোটিনগুলো ক্যান্সার কোষের মতো নির্দিষ্ট কোষগুলোকে চিনতে, আবদ্ধ করতে এবং লক্ষ্যযুক্ত থেরাপি প্রদান করতে উপকারী। Herceptin এর মতো ওষুধ (স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত) এই জৈবপ্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। হেপাটাইটিস-বি, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) এবং COVID-19 এর মতো রোগের ভ্যাক্সিন গুলো রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির উদ্ভাবন।

জৈব জ্বালানী উৎপাদনে জৈবপ্রযুক্তি 
নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদার ফলে, জীবাশ্ম জ্বালানির টেকসই বিকল্প হিসেবে জৈব জ্বালানী কে সামনে নিয়ে এসেছে। বায়োইথানল, বায়োডিজেল এবং বায়োগ্যাসসহ জৈব জ্বালানীগুলো জৈবপদার্থ যেমন উদ্ভিদ, কৃষিকাজের অবশিষ্টাংশ এবং শেওলা থেকে উৎপাদিত হয়।  

জৈব জ্বালানী ক্ষেত্রের একটি উদাহরণ হলো, ইস্ট দ্বারা গাঁজন ব্যবহার করে ভ‚ট্টা বা আখ থেকে বায়োইথানল উৎপাদন। প্রক্রিয়াটি এই ফসলগুলোর শর্করাকে ইথানলে রূপান্তর করে যা একটি পরিষ্কার-জ্বলন্ত জ্বালানী তৈরি করতে পেট্রোলের সাথে মিশ্রিত করা যেতে পারে। এছাড়াও উদ্ভিদ-ভিত্তিক জৈব জ্বালানী তৈরিতে, শৈবাল বায়োডিজেলের একটি সম্ভাব্য উৎস। শৈবালগুলো প্রচলিত উপাদানের তুলনায় অনেক বেশি হারে তেল উৎপাদন করতে পারে এবং জৈবপ্রযুক্তি গবেষণা তেল উৎপাদন সর্বাধিক করার জন্য শৈবালের স্ট্রেন বাড়ানোর উপর কাজ করে যাচ্ছে।

পরিবেশ সংরক্ষণে জৈবপ্রযুক্তি 
পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে এবং স্থায়িত্বকে বৃদ্ধি করতে শিল্পচর্চায়ও জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হলো বায়োলিচিং (Bioleaching), যেখানে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয় আকরিক থেকে মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা বা তামা আহরণ করতে। এই প্রক্রিয়াটি প্রচলিত খনিখনন পদ্ধতির চেয়ে কম ক্ষতিকর।  ব্যাকটেরিয়া ধাতব সালফাইডকে দ্রবণীয় ধাতব আয়নে রূপান্তর করে, ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যাবহার ছাড়াই ধাতুগুলো পুনরুদ্ধার করা সহজ করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হলো ফাইটোরিমিডিয়েশন (Phytoremediation), যেখানে গাছপালা, মাটি ও পানি থেকে ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ শোষণ করতে ব্যবহৃত হয়। এই গাছপালাগুলো প্রায়ই হাইপারঅ্যাকুমুলেটর (Hyperaccumulator) হিসেবে কাজ করে। দূষিত পরিবেশ পরিষ্কার করার জন্য একটি সবুজ এবং টেকসই সমাধান প্রদান করে, বিষ শোষণ করার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য জিনগত পরিবর্তন করার জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যাচ্ছেন।

টেক্সটাইল শিল্পে জৈবপ্রযুক্তি 
জৈবপ্রযুক্তি প্রচলিত টেক্সটাইল উৎপাদন প্রক্রিয়ার টেকসই এবং দক্ষ বিকল্প সরবরাহ করে। টেক্সটাইল শিল্পে জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফলে, পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করা এবং ফাইবার ও কাপড় তৈরির উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। 

জৈব-পলিশিং করে সূতির কাপড়ের পৃষ্ঠ থেকে ক্ষুদ্র তন্তু অপসারণ করতে Cellulase এনজাইম ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি কাপড়টিকে একটি মসৃণ টেক্সচার দেয় এবং তাদের স্থায়িত্ব বাড়ায়।এটি যান্ত্রিক বা রাসায়নিক পলিশিং প্রক্রিয়াগুলোর একটি পরিবেশগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ বিকল্প। জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিক রঞ্জক তৈরি করতে পারে যা পরিবেশ-বান্ধব রঞ্জক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই মাইক্রোবিয়াল রঞ্জকগুলো বায়োডিগ্রেডেবল, অবিষাক্ত এবং সিন্থেটিক রঞ্জকগুলোর তুলনায় কম রাসায়নিকের প্রয়োজন হয়। 

জৈবপ্রযুক্তি টেক্সটাইল উৎপাদনে বিপজ্জনক বর্জ্য উৎপাদন কমাতে সাহায্য করে। বায়োডিগ্রেডেবল এনজাইম এবং জৈবভিত্তিক উৎপাদনের ব্যবহার ক্ষতিকারক রাসায়নিক এবং কৃত্রিম বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাস করে। তদুপরি, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে PLA এবং অ্যালজিনেটের মতো ফাইবার উৎপাদন পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক উপকরণের উপর নির্ভরতা হ্রাসসহ আরো টেকসই টেক্সটাইল শিল্পে অবদান রাখে।

শিল্প জৈবপ্রযুক্তি (Industrial Biotechnology) ও কৃষিক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তি 
কৃষিতে, জৈবপ্রযুক্তি এমন ফসলের বিকাশে ব্যবহৃত হয় যা, কীটপতঙ্গ, রোগ এবং কঠোর পরিবেশগত অবস্থার প্রতিরোধ করতে পারে। বিটি তুলা এবং বিটি ভুট্টার মতো জেনেটিক্যালি পরিমর্তিত (জিএম) ফসলে Bacillus thuringiensis এর জিন থাকে, যা প্রাকৃতিক কীটনাশক তৈরি করে। এই ফসলগুলো রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য হ্রাসের দিকে পরিচালিত করে, কৃষক এবং পরিবেশ উভয়কেই উপকৃত করছে।

শিল্প জৈবপ্রযুক্তি, যা প্রায়শই সাদা জৈবপ্রযুক্তি হিসেবে প্রচলিত, যাতে রাসায়নিক উপকরণ এবং শক্তি তৈরির জন্য জন্য জৈবপ্রযুক্তি ব্যাবহারের উপর দৃষ্টি নিবন্ধ করে। অণুজীব দ্বারা উৎপাদিত এনজাইমগুলো ডিটারজেন্ট, টেক্সটাইল এবং কাগজ উৎপাদনের মতো শিল্পগুলোতে প্রয়োগ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, Cellulase এনজাইম কাগজ উৎপাদনে সেলুলোজ ভাঙতে ব্যবহৃত হয়, যা রাসায়নিক প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে প্রক্রিয়াটিকে আরো পরিবেশগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলে।

জৈবপ্রযুক্তিতে চ্যালেঞ্জ
১) নৈতিক উদ্বেগ: জৈবপ্রযুক্তির প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলো একটি হলো জেনেটিক ম্যানিপুলেশন এবং জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত জীবের (জিএমও) বিকাশের আশেপাশের নৈতিক উদ্বেগ। উদাহরণস্বরূপ, মানব-ভ্রূণ সম্পাদনা করার জন্য CRISPS-Cas9 প্রযুক্তির ব্যাবহার 'ডিজাইনার শিশু' তৈরির সম্ভাবনা সম্পর্কে নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মে জিনোম পরিবর্তন হওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে।

২) জনসাধারণের উপলব্ধি এবং গ্রহণযোগ্যতা: জৈবপ্রযুক্তি গ্রহণে জনসাধারণের উপলব্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। জিএমও, জিন থেরাপি এবং সিন্থেটিক বায়োলজি সম্পর্কে ভুল তথ্য এবং বোঝার অভাব জনসাধারণের প্রতিরোধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য সত্তে¡ও যে জিএমওগুলো মানুষের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ, জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষিতে তাদের ব্যবহার সম্পর্কে সন্দিহান। 

৩) পরিবেশগত এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ: জৈবপ্রযুক্তি যদি কৃষি এবং শিল্পে সাবধানে পরিচালিত না হয় তবে তা পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। জিএমও বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য প্রবর্তন করতে পারে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্রকে ব্যাহত করে। অধিকন্তু, বড় আকারের উৎপাদন ব্যাবস্থায় জৈবপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে পরিবেশের উপর বিভিন্ন ধরণের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

বায়োটেকনোলজির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বায়োটেকনোলজির ভবিষ্যত আশাব্যঞ্জক, চলমান উদ্ভাবনগুলো স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শক্তি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মতো শিল্পে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
১) ব্যক্তিগতকৃত ওষুধ এবং জিন থেরাপি: জৈবপ্রযুক্তির সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ভবিষ্যত সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে একটি হল ব্যক্তিগতকৃত ওষুধের বিকাশ। নির্ভুল ওষুধ প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিতসার বিষয়ে সিদ্ধান্তগুলোকে নির্দেশনা দিতে রোগীর জেনেটিক প্রোফাইল ব্যবহার করে৷ মেরুদন্ডের পেশীর অ্যাট্রোফির চিকিতসার জন্য ব্যবহৃত Zolgensma মতো জিন থেরাপির সাফল্য, স্বাস্থ্যসেবাকে রূপান্তর করতে এই থেরাপিগুলির সম্ভাব্যতা তুলে ধরে। 

২) খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি জৈবপ্রযুক্তি: বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কম সম্পদের সাথে আরও বেশি খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষির উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি বায়োফোর্টিফাইড ফসলের বিকাশকে সহজতর করে, যা ভিটামিন এবং খনিজগুলির মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিয়ে সমৃদ্ধ। গোল্ডেন রাইস, একটি জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ধানের জাত যা বিটা-ক্যারোটিন উৎপন্ন করে, যার লক্ষ্য হল সেই অঞ্চলে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি দূর করা যেখানে চাল একটি প্রধান খাদ্য। 

৩) জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে জৈবপ্রযুক্তি: বায়োটেকনোলজিতে আরও টেকসই কৃষি অনুশীলন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসাবে জৈব জ্বালানি বিকাশের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো হ্রাস করার সম্ভাবনা রয়েছে। সিন্থেটিক বায়োলজি এবং মাইক্রোবিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অগ্রগতি কার্বন-ক্যাপচারিং জীবের বিকাশকে সক্ষম করতে পারে, যা বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ এবং সংরক্ষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। 

শিল্পে জৈবপ্রযুক্তির প্রয়োগ প্রচলিত প্রক্রিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, সেগুলোকে আরও দক্ষ, টেকসই এবং পরিবেশ-বান্ধব করে তুলেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ওষুধশিল্প, জৈব জ্বালানি এবং পরিবেশগত সংরক্ষণ, জৈবপ্রযুক্তি শিল্প অনুশীলনের ভবিষ্যত গঠন করে চলেছে। গবেষণার অগ্রগতি এবং নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য বায়োটেকনোলজির সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। 

তথ্যসূত্র
1.  Berni M, Dorileo I, Prado J, Forster-Carneiro T. Advances in Biofuel Production [Internet]. 2013 [cited 2024 Sep 22]. Available from:              https://www.researchgate.net/publication/258257820_Advances_in_Biofuel_Production

2.  Collins FS, Varmus H. A New Initiative on Precision Medicine. N Engl J Med. 2015 Feb 26;372(9):793–5. 

3.  Kiron MI. Application of Biotechnology in Textile Industry [Internet]. Textile Learner. 2021 [cited 2024 Sep 23]. Available from: https://          textilelearner.net/application-of-biotechnology-in-textile-industry/

4.  Singh RS. Industrial Biotechnology: An Overview. 

5.  S R, Ponnusami V, Singh P. Biotechnological Approaches in Waste Management. 2022. 

6.  Soetaert W, Vandamme E. Industrial Biotechnology: Sustainable Growth and Economic Success. Industrial Biotechnology: Sustainable            Growth and Economic Success. 2010. 

7.   Tang WL, Zhao H. Industrial biotechnology: Tools and applications. Biotechnology Journal. 2009 Dec;4(12):1725–39. 

8.   Zhao L, Lu L, Wang A, Zhang H, Huang M, Wu H, et al. Nanobiotechnology in Agriculture: Use of Nanomaterials to Promote Plant                 Growth and Stress Tolerance. Journal of Agricultural and Food Chemistry | 10.1021/acs.jafc.9b06615 [Internet]. 2010 [cited 2024 Sep 22].        Available from: https://sci-hub.se/10.1021/acs.jafc.9b06615

9.   Mallela K. Pharmaceutical biotechnology - concepts and applications: Walsh Gary Wiley, Chichester, West Sussex, UK. Human Genomics.       2010 Feb 1;4(3):218. 

10.  Yi H, Li M, Huo X, Geng G, Lai C, Huang D, et al. Recent development of advanced biotechnology for wastewater treatment: Critical              Reviews in Biotechnology: Vol 40, No 1 [Internet]. 2019 [cited 2024 Sep 22]. Available from: https://www.tandfonline.com/doi/                        abs/10.1080/07388551.2019.1682964

 

তাপসী হাবীবা 
এনভায়রনমন্টোল সায়ন্সে এন্ড ইঞ্জনিয়ারিং বিভাগ 
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Ads