আইএফএবি আইনে যৌক্তিক আর্জেন্টিনার জয়

স্পোর্টস ডেস্ক

০৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম


আইএফএবি আইনে যৌক্তিক আর্জেন্টিনার জয়


ফুটবল মাঠে সমর্থকদের আবেগ থাকাটা স্বাভাবিক, তবে দিনশেষে খেলাটি চলে নির্ধারিত কিছু নিয়মের ভিত্তিতে। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে আইএফএবি-র (ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড) স্পষ্ট আইনের প্রয়োগ দেখা গেছে, যা আবেগের চেয়ে নিয়মের সত্যতাকেই বেশি প্রমাণ করে।

বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ম্যাচে মিসরকে বিদায় করে শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের খেলা শেষ হলেও এই ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের ঝড় থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবলপাড়ায় এখন মূল আলোচনার বিষয় দুটি—মিসরের বাতিল হওয়া গোল এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের ঠিক আগমুহূর্তে মোহাম্মদ সালাহকে ফাউল করার ঘটনা। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের দাবি, মাঠের রেফারি এবং ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) বিতর্কিতভাবে আর্জেন্টিনার পক্ষে সুবিধা দিয়েছে।

মিসরের মোস্তফা জিকোর গোলটি বাতিলের ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ওপর হওয়া ফাউলটিতে রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সংকেত দিয়েছিলেন। আইএফএবি ভিএআর প্রোটোকলের ২ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী, ‘কোনো সিদ্ধান্ত নেই’ বলে রেফারি চুপ থাকতে পারেন না; খেলা চালিয়ে যেতে দেওয়াটাও রেফারির একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয়। যেহেতু এটি একটি সিদ্ধান্ত ছিল, তাই নিয়ম মেনেই ভিএআর এই ঘটনাটি পুনরায় পর্যালোচনা করার পূর্ণ অধিকার রেখেছিল।

৩০ সেকেন্ডের ব্যবধান ও নিখুঁত সিদ্ধান্ত
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ফাউল হওয়ার প্রায় ৩০ সেকেন্ড পর গোল হলো, তাহলে এত আগের ঘটনায় কেন ফিরে যাওয়া হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আছে ভিএআর প্রোটোকলের ৬ নম্বর নিয়মে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নির্ভুল সিদ্ধান্তের স্বার্থে পর্যালোচনার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফাউলের পর খেলা চললেও সেটি যদি একই আক্রমণাত্মক ধারার (Attacking Phase) অংশ হয় এবং তার সূত্র ধরে গোল আসে, তবে রেফারি আগের ফাউল দেখে গোল বাতিল করতে পারেন। ফলে জিকোর গোল বাতিলের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ নিয়মসম্মত ছিল।

সালাহর ফাউল বিতর্ক ও ভিএআর-এর নীরবতা
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহকে ফাউল করার দাবিতে সরব ছিল মিসর শিবির। কিন্তু সেখানে ভিএআর কেন হস্তক্ষেপ করল না, তার ব্যাখ্যা রয়েছে প্রোটোকলের ৩ নম্বর নিয়মে। এই নিয়ম বলে, মাঠের রেফারির মূল সিদ্ধান্ত তখনই পরিবর্তন করা যাবে, যখন ভিডিওতে সেটি একটি 'সুস্পষ্ট ও অনিবার্য ভুল' (Clear and Obvious Error) হিসেবে প্রমাণিত হবে। সালাহর ক্ষেত্রে রেফারির সিদ্ধান্তকে তেমন কোনো বড় ভুল মনে না হওয়ায় ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী নীরব ছিল।

মাঠে আবেদনের সুযোগ নেই
ম্যাচ চলাকালীন মিসরের খেলোয়াড় ও কোচকে বারবার ভিএআর রিভিউর জন্য আবেদন করতে দেখা গেছে। তবে ভিএআর ব্যবস্থায় দলগুলোর পক্ষ থেকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধের নিয়ম নেই। প্রোটোকলের ১২ নম্বর নিয়ম জানাচ্ছে, ভিএআর প্রযুক্তি নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাঠের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ফ্রেম নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে। তাই কোনো দলের চাওয়ায় নয়, ভিএআর নিজস্ব নিয়মেই কাজ করে।

নিয়মের ইতিহাস ও মিসরীয় সংযোগ
ফুটবল ইতিহাসে নিয়মের এই অমোঘ রূপ নতুন কিছু নয়। ১৯৯০ বিশ্বকাপে মিসরের তৎকালীন গোলরক্ষক আহমেদ শোবেইর (চলতি ম্যাচের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের বাবা) আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যাক-পাসের নিয়মকে কাজে লাগিয়ে বারবার বল হাতে ধরে সময় নষ্ট করেছিলেন। তৎকালীন নিয়মে সেটি বৈধ হলেও, এই ঘটনার পরই ১৯৯২ সালে ফিফা ব্যাক-পাস আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।

ইতিহাস
ইতিহাসের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে ফুটবল দল দেখে চলে না, চলে নিয়মের ভিত্তিতে। এক সময়ের নিয়ম যেমন মিসরের পক্ষে ছিল, বর্তমানের প্রোটোকল তেমনই আর্জেন্টিনার পক্ষে গেছে। রেফারি বা ভিএআর-এর সিদ্ধান্ত সবার মনঃপূত নাও হতে পারে, কিন্তু আইএফএবি-র আইনের কড়া দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখলে এই ম্যাচের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল সম্পূর্ণ আইনানুগ ও সঠিক।

Ads