হরমুজে ফি দিতে সম্মত ইউরোপ: নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে কূটনৈতিক লড়াই তুঙ্গে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৩ এএম


হরমুজে ফি দিতে সম্মত ইউরোপ: নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে কূটনৈতিক লড়াই তুঙ্গে

 

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৌ-নির্দেশনা সেবার বিপরীতে ফি আরোপের একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইউরোপীয় দেশগুলো। তবে এই ফি বাধ্যতামূলক হবে না এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন থাকলেই কেবল তা কার্যকর করা যেতে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। ওমান সাগরের সংযোগস্থল ও পারস্য উপসাগরের এই প্রবেশদ্বারটি দিয়ে বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অতিরিক্ত মাশুল বা নতুন নিয়ম আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

প্রণালির নিরাপত্তা ও টোল ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপ করা হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হবে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো আন্তর্জাতিক জলপথে যেভাবে নির্দিষ্ট নৌ-সেবা বাবদ অর্থ নেওয়া হয়, একই ধরনের ব্যবস্থা হরমুজেও বিবেচনা করা যেতে পারে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের এই কৌশলী অবস্থান ইঙ্গিত করে যে, তারা একদিকে যেমন অবাধ বাণিজ্যপথ নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে সামগ্রিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় আর্থিক দায়িত্বও ভাগাভাগি করতে আগ্রহী।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই পথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ও স্পষ্ট ঘোষণা দিতে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা ও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও পশ্চিমা বিশ্বের এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ।

বিশ্ব রাজনীতির এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তিটি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং বাণিজ্যিক রুট সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে নতুন করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন, যা ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এক বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটিই বর্তমান ইরানি জাতির মূল ইচ্ছা। নতুন নেতার এই অনমনীয় মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, যার সরাসরি প্রভাব হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ইতোমধ্যে মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি কার্যকর দ্বিপাক্ষিক প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রস্তুত ওই পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনাটি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে ওমান তাদের বিশেষ আইন বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পাঠাতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ওমান মূলত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে এই অঞ্চলের নৌ-বাণিজ্য সচল রাখতে চাইছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি ও সামগ্রিক নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও ওমানের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্রুত একটি যৌক্তিক ও টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে যে বিশেষ ছাড় দিয়েছিল, তা বেআইনিভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ ওমানের জলসীমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওমান কোনোভাবেই এখানে বাধ্যতামূলক টোলের পক্ষে নয় এবং তারা এর তীব্র বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে প্রতিবেশি কাতারও সুর মিলিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে ইরানকে এই প্রণালির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর এই ভিন্নমুখী অবস্থান সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সংকট শুধু বাইরে নয়, ইরানের ভেতরেও রয়েছে। দেশটির প্রভাবশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়ে অনাগ্রহী এবং তারা প্রণালিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ চায়; অন্যদিকে দেশটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশটি বৈশ্বিক সহযোগিতার পক্ষে। ফলে হরমুজ নীতি নিয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে স্পষ্ট মতপার্থক্য দৃশ্যমান হচ্ছে।

সম্প্রতি লন্ডনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি সাফ জানিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত রয়েছে এবং সেখানে কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের আইনি সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা জোরদার, সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা এবং যেকোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছামূলক বা স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

এদিকে আইএমও-এর বৈঠকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র মিলে ইরানের বিরুদ্ধে একটি কঠোর নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করলেও পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি, বরং তারা ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার মতে, এই প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। অন্যদিকে চীনের ভাষ্য, প্রস্তাবটি অত্যন্ত একপেশে এবং এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) আইনি এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে মূল বিতর্ক ও অচলাবস্থা দুটি প্রধান বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। প্রথমটি হলো—হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার পর এর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা কার হাতে থাকবে; আর দ্বিতীয়টি হলো- দীর্ঘমেয়াদে এই প্রণালির প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো কী হবে এবং এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির সফল মডেলটি ইরানের জন্য শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে কি না।

উল্লেখ্য, গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি বিশেষ সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ বা ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই সাময়িক প্রতিশ্রুতির অর্থ এই নয় যে, ইরানের পূর্ব অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা ব্যবহার করতে পারবে না।

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, চলতি মে মাসের শুরু থেকে তাদের নৌবাহিনী ও সামরিক মিত্ররা এ পর্যন্ত ৮০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সরাসরি সহায়তা করেছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের এই দাবিকে ছাপিয়ে আইআরজিসি (IRGC) নৌবাহিনী পাল্টা দাবি করেছে, সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব তারা সফলভাবে পালন করেছে এবং এই জলপথে কোনো বিদেশি বা পশ্চিমা বাহিনীর ভূমিকা থাকার কোনো বৈধ সুযোগ নেই।

Ads