১৮০ দিন পার হলেও নারী-শিশু নির্যাতন মামলার বিচার চলবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম


১৮০ দিন পার হলেও নারী-শিশু নির্যাতন মামলার বিচার চলবে

ছবি: সংগৃহীত

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও মামলা বাতিল বা বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়; এটি নির্দেশনামূলক।

ফলে নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলেও আসামির বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন রায়টি ঘোষণা করেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা বিশ্লেষণ করে বলেন, নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলা বাতিল বা বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করার কোনো বিধান আইনে নেই। তাই ওই সময়সীমা পার হয়ে গেলেই মামলার কার্যক্রম অকার্যকর হয়ে যাবে—এমন ব্যাখ্যার সুযোগ নেই।

আদালত আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব। তবে ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করাকে বিচারিক কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিতের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, ইডেন কলেজের এক ছাত্রীর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে আসামি মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ৮ জুলাই একটি বাসায় নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। পরে একাধিকবার ধর্ষণের ফলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন এবং পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর মা ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। পরে মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারার্থে পাঠানো হয়।

২০০৮ সালের ২৩ জুলাই পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন।

বিচার নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ না হওয়াকে কারণ দেখিয়ে ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট করেন পাভেল। তার দাবি ছিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ায় মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আইনগত সুযোগ নেই।

তিনি আরও দাবি করেন, নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর ও পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।

রিটের পর হাইকোর্ট মামলার বিচারিক কার্যক্রম প্রথমে তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে বিভিন্ন সময়ে সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট ২০২৩ সালের ৭ জুন রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।

আদালত রায়ে বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকার বিষয়ে রিটকারী কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে, বিচারিক কার্যক্রম স্থগিতের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো রিটকারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় সৃষ্টি করে না।

ফলে হাইকোর্ট রুলটি খারিজ করে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করেন। একই সঙ্গে ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করলেই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারিক কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত হবে না—এ বিষয়টি স্পষ্ট করেন আদালত।

Ads