“প্লাস্টিক বর্জ্য যখন সম্পদ, জৈবিক পুনরুদ্ধারই উত্তম সমাধান”

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৫:৪৬ পিএম


“প্লাস্টিক বর্জ্য যখন সম্পদ, জৈবিক পুনরুদ্ধারই উত্তম সমাধান”

মো: শাকির হোসাইন সরকার

প্লাস্টিক, বহুল পরিচিত একটি শব্দ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের সিংহভাগ প্লাস্টিকের তৈরি। রান্নাঘর থেকে নিয়ে শুরু করে বড় বড় কল কারখানাতেও রয়েছে এর বহুমূখী ব্যবহার। অধিক ব্যবহারের পিছনে প্লাস্টিকের রয়েছে বিশেষ ধরনের সুবিধা। সুবিধাগুলির মাঝে অন্যতম হলো এর উৎপাদন খরচ কম, সহজে উৎপাদন যোগ্য, পানির সাথে সংবেদনহীনতা ইত্যাদি। প্লাস্টিক পণ্যের মাঝে অন্যতম হলো: বিভিন্ন ধরনের বোতল, জগ, মগ, কাপড়, পাইপ, থালাবাসন ইত্যাদি। প্লাস্টিক একটি জৈব যৌগ যা সিন্থেটিক অথবা আধা সিন্থেটিক হতে পারে। কম তাপমাত্রায় গলে বলে একে সুবিধাজনক আকৃতি দেওয়া যায়। বাজারে বিভিন্ন প্রকারের প্লাস্টিক পাওয়া যায় যার মধ্যে পলিইথিলিন, পলেস্টার, পলিপ্রোপাইলিন ও পলিস্টাইরিন অন্যতম।
বর্তমান সময়ে প্লাস্টিক উৎপাদন রাসায়নিক শিল্পের প্রধান অংশ হয়েছে। প্লাস্টিকের এতো সুবিধা থাকলেও এর রয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব।

আমরা যেসব প্লাস্টিক ব্যবহার করি তার অধিকাংশই টেকসই এবং খুব ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি করে। নিয়মিত প্লাস্টিক পদার্থের ব্যবহার প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যে প্লাস্টিকগুলো ব্যবহৃত হয় তার অধিকাংশই পুনঃব্যবহার, পুনরুদ্ধার ও পুনঃচক্রায়ন হয় না। পরবর্তীতে এগুলো বর্জ্যের আকার নেয়। আমাদের অসচেতনাই এই দূষণের প্রধান কারণ। প্লাস্টিক অপাচ্য পদার্থ বলে এটি পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থপনার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে অন্যতম ধাপ হলো ’’প্লাস্টিক বর্জ্যরে জৈবিক পুনরুদ্ধার”।  

বর্তমান সময়ে এই প্রক্রিয়াটি অধিক ফলপ্রসু একটি পদ্ধতি, প্রক্রিয়াটি সংক্ষিপ্তভাবে নিচে বর্ণিত হলোঃ গ্যাস পুনরুদ্ধার সাথে বর্জ্যের কম্পোস্টিং ও অবাত ভাঙন প্লাস্টিকের জৈবিক পুনরুদ্ধার বিকল্পগুলির একটি। কম্পোস্টিং হলো থার্মোফিলিক জীবাণু দ্বারা সহজলভ্য উৎপাদনের বায়বীয় ভাঙন। বাণিজ্যিক কম্পোস্টিং ৪০-৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় করা হয়। আর এই তাপমাত্রায় কোন রোগজীবাণু থাকতে পারেনা, অ্যানেরোবিক ডাইজেশনে বায়োমাসকে বায়োগ্যাস পরিণত করা হয়। বায়োমাস সেইসব জৈব বস্তুকে বোঝায় যাদের শক্তিতে রুপান্তর করা যায়। আর সেই সাথে উৎপন্ন হয় মিথেন ও কার্বন-ডাইঅক্সাইড গ্যাস যা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রতিস্থাপক হিসেবে বা তাপ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কম্পোস্টিংয়ের বিপরীতে অ্যানেরোবিক হজমকারী থার্মফিলিক, মেসোফিলিক (৩৫-৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) বা সাইকোফিলিক (১৫২০ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) অবস্থার অধিনে কাজ করতে পারে। থার্মোফিলিক ও মেসোফিলিক ভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া যারা যথাক্রমে উচ্চ তাপমাত্রায় ও মাঝারি তাপমাত্রায় বসবাস বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় মেসোফিলিক তাপমাত্রায় বর্জ্যের কোন রোগ জীবাণু কন্টেন্ট হ্রাস হিসেবে রিপোর্ট করা হয়। তবে সেক্ষেত্রে ডাইজেস্টরগুলি বদ্ধ থাকে এবং কেবল গ্যাস ব্যবহারের জন্য অপসারণ করা হয়। পৌর বর্জ্যের চিহ্নিত কঠিন বস্তুর প্রধান হলো প্লাস্টিক যা সরাসরি বায়োডিগ্রেডেবল না, তাই এগুলোকে জৈব পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়াগুলি বেচেঁ থাকবে যদিও কম্পোস্টিংয়ের সাথে কিছু জারণ এবং খন্ড খন্ড হতে পারে। পুনচক্রায়ন ও পুনরুদ্ধার দুটি বিকল্প পৌর বর্জ্য প্লাস্টিকের ভগ্নাংশের জন্য কঠোরভাবে প্রযোজ্য নয়।

বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকগুলির এখনও পৌর বর্জ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ নয়। এটার প্রধান কারণ হলো আমাদের দেশে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার কম। যদি প্রকৃতপক্ষে এগুলো বর্জ্যের মাঝে উপস্থিত থাকে এবং অ্যানেরোবিকভাবে হ্রাসযোগ্য হয় তবে এগুলিও বায়োগ্যাসে রুপান্তরিত হবে। কিছু বায়োভিত্তিক পলিমার যেমন পিএলএ, পিএইচএ এবং অনান্যকে প্যাকেজিং এ ব্যবহারের জন্য ‘‘কম্পোস্টেবল” প্লাস্টিক হিসেবে প্রচার করা হয়। কম্পোস্টিং একটি বায়োডিগ্রেডেশন প্রক্রিয়া যা
বর্জ্যকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও কম্পোস্ট সাবস্ট্রেটে রুপান্তরিত করে। বর্জ্যরে মধ্যে অবস্থিত পলিমারকে সম্পূর্ণ খনিজকরণ করা হয়। যদি পুনরুদ্ধারক হিউমিক অবশিষ্টাংশ না ছাড়ে এবং কম্পোস্ট পণ্যের অবদান না থাকে তবে তা কম্পোস্টিংয়ের উপযুক্ত নয়। প্লাস্টিক কম্পোস্ট করার বিভিন্ন ধরনের এপ্লিকেশন রয়েছে। কম্পোস্টেবল প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাগ বর্জ্য হিসেবে অপসারণ ছাড়াই সুবিধামত কম্পোস্ট করা যায়।  

আমরা প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করতে সক্ষম নই কেননা প্লাস্টিকের উত্তম বিকল্প এখনই নাই। কিছু প্যকেটজাত দ্রব্য যা প্লাস্টিক পদার্থ ছাড়া প্যাকেজিং করা সম্ভব নয়। আমরা যদি এখানে কম্পোস্টেবল প্লাস্টিক ব্যবহার করি তবে সেটাই শ্রেয় হবে। এই ক্ষেত্রে উৎপাদিত প্লাস্টিকের গুণগত মান অনান্য প্লাস্টিকের থেকে উন্নত হবে। এই প্রক্রিয়া একদিক থেকে যেমন কম অর্থ লাগে তেমনি এটি পরিবেশেবান্ধবও বটে। আর আমরা যদি প্লাস্টিক শুধু ব্যবহার করেই যাই তাকে ব্যবস্থাপনা করার চিন্তা না করি তবে তা হবে আমাদের পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরুপ। এগুলি ভ‚মির উর্বরতা যেমন নষ্ট করে সেই সাথে প্রাণিকুলের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে পুকুর, নদী, বিভিন্ন ধরনের লেক এখন প্লাস্টিক দূষণের কারণে হুমকির মুখে। সমুদ্রে প্লাস্টিক ফেলার ফলে সামুদ্রিক প্রাণিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার, পুনরুদ্ধার, পুনচক্রায়ন, ইত্যাদি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া উচিত।

প্লাস্টিক বর্জ্যের জৈবিক পুনরুদ্ধার হতে পারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উত্তম সমাধান। একই সাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শক্তি উৎপাদন দুটোই হবে। অর্থনৈতিক ভাবে আমরা যেমন হবো লাভবান তেমনই এটি পরিবেশের জন্যও কম ক্ষতিকর। খোলা মাঠে পোড়ানো বা ভষ্মীকরণ পরিবেশের জন্য যতটা ক্ষতিকর জৈবিক পুনরুদ্ধার ততোটা ক্ষতি করেনা। এক্ষেত্রে যে বায়োগ্যাস উৎপন্ন হয় তা পরিবেশ বান্ধব একটি জ¦ালানি। একটা কথা বলা হয়ে থাকে যে, “বর্জ্য নয় বর্জ্য, বর্জ্য হলো সম্পদ”। যদি আমরা বর্জ্যের যথাযথ ব্যবহার করতে পারি তবে এগুলি হয়ে যাবে আমাদের সম্পদ। আমাদের একটি পদক্ষেপই পারে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে। এ ব্যাপারে কোনো ব্যক্তির উগ্যোগে ভালো কিছু আশা করা বোকামি। সকলের সমন্বিত উদ্যোগে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সরকারি, বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগে প্লাস্টিকের জৈবিক পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে আমরা প্লাস্টিকের বর্জ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে পারি।

মো: শাকির হোসাইন সরকার
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

 

Ads