নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য পূরণে বছরে ৯৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন
০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম
বাংলাদেশের ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমান বিনিয়োগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আইইইএফএর হিসাবে, এ লক্ষ্য পূরণে প্রতিবছর প্রায় ৯৩৩ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার।
দাইরার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর: ২০৩০ সালের ঘাটতি পূরণ ও সামনের অর্থনৈতিক সুযোগ’ শীর্ষক ওয়েবিনারে উপস্থাপিত গবেষণায়ও অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রিড অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, তথ্যব্যবস্থা ও নীতির ধারাবাহিকতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৪০ সালের জন্য এ লক্ষ্য ৩০ শতাংশ। ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রায় ৬ হাজার ১৪৫ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা প্রয়োজন হবে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
দাইরার গবেষণা উপস্থাপনায় বলা হয়, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৩৫৮ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা নির্মাণাধীন ছিল। ২০৩০ সালের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ালেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সক্ষমতা, বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের ব্যবস্থা এবং বিতরণ অবকাঠামোর আধুনিকায়নও একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে বলে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসংস্থান তৈরিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সম্ভাবনাময়। প্রতি মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২৬ দশমিক ৬টি কর্মসংস্থান তৈরির হিসাব দেওয়া হয়েছে। ইউটিলিটি-স্কেলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াটে এ সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ১।
আইইইএফএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বার্ষিক গড় বিনিয়োগ ছিল প্রায় ২৩৮ মিলিয়ন ডলার। ফলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় বার্ষিক বিনিয়োগ বর্তমান ঐতিহাসিক গড়ের প্রায় চারগুণ।
ওয়েবিনারে র্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সিওও ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের অ্যাডজাঙ্ক্ট ফ্যাকাল্টি মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলমের উপস্থাপিত মতামতে বাংলাদেশের বর্তমান গ্রিড কাঠামোর সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছাদভিত্তিক ও বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটাতে হলে দ্বিমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহের উপযোগী বিতরণ নেটওয়ার্ক, উন্নত ট্রান্সফরমার, আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ব্যাটারি স্টোরেজ প্রয়োজন হবে।
এ বিষয়ে আলোচনায় আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত স্টোরেজ ও গ্রিড পরিকল্পনা ছাড়া দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করলে বিদ্যুৎব্যবস্থায় ভারসাম্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর পরিকল্পনা সমন্বিতভাবে করা প্রয়োজন।
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য নীতির স্থায়িত্বের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওয়েবিনারে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল অন্তত পাঁচ বছরের নীতিগত নিশ্চয়তা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টির বক্তব্যে জ্বালানি রূপান্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তাঁর মতামত অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণ এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে কার্যকর নজরদারি বিনিয়োগের পরিবেশকে শক্তিশালী করতে পারে।
ওয়েবিনারের সঞ্চালক দাইরার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সাকিব বিন আমিন বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর আলোচনায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওটি) মডেল ব্যবহারের বিষয়টি আসে।
তিনি বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের সক্ষমতা বাড়ানো, জাতীয় জ্বালানি তথ্যকেন্দ্র গঠন, ভর্তুকির প্রকৃত সুবিধাভোগী নিশ্চিত করা এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে জ্বালানি দক্ষতা ও চাহিদা ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, অর্থায়নের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। আইইইএফএ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি ও প্রকল্প মূল্যায়নের জটিলতা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে বাধা তৈরি করছে।
এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান সক্ষমতার হিসাব বিভিন্ন উৎসে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে এসআরইডিএর জাতীয় ডাটাবেসের তথ্য উদ্ধৃত করে দেশে স্থাপিত নবায়নযোগ্য সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮২২ মেগাওয়াট বলা হয়েছে। তাই নির্মাণাধীন, স্থাপিত এবং গ্রিড-সংযুক্ত সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে, ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে একই সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, গ্রিড আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চয় এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার দিকে এগোতে হবে। লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি এসব খাতে বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করাই এখন বড় বিষয়।






























